জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে বিরোধীদল থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে একটি সংসদীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে সরকারি ও বিরোধীদলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, সংসদ সদস্যদের অধিকার এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। এই ঘটনা সংসদের কার্যক্রমে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিতর্কের সূত্রপাত করেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, যিনি জানান যে গাজী নজরুল ইসলাম পূর্বে কয়েকটি স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। তবে বিরোধীদলীয় নেতার অনুরোধ এবং চিঠির প্রেক্ষিতে তাকে সেসব কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। চিফ হুইপ জোর দিয়ে বলেন, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে পদ বহাল থাকা অবস্থায় সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া স্পিকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিরোধীদল বা সরকারি দলের বাইরের কোনো কমিটিতে তাকে রাখা সম্ভব না হওয়ায় এবং গুরুত্বপূর্ণ দুটি কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার পর তাকে একটি তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বছরে মাত্র একবার বা দুবার বসে। তবে, চিফ হুইপ স্পষ্ট করে দেন যে, বিরোধীদলের আপত্তি থাকলে গাজী নজরুলের নাম কমিটি থেকে বাদ দিতে সরকারি দলের কোনো দ্বিধা নেই।
চিফ হুইপের বক্তব্যের পর বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান তার বক্তব্য শুরু করেন। তিনি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে, গাজী নজরুল ইসলামকে বিরোধীদলের কোটা থেকে সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া হয়নি। ড. শফিকুর রহমান দৃঢ়ভাবে বলেন, বিরোধীদলের পক্ষ থেকে গাজী নজরুলকে কোনো কমিটির জন্য প্রস্তাব করা হয়নি। তার মতে, নৈতিক কারণে গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং তাই জাতীয় সংসদের মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কোনো কমিটিতে তাকে না রাখাই সংগত ও নৈতিক ছিল। তিনি আরও বলেন, যেহেতু সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে, তাই গাজী নজরুলকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হলে তা একটি ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং সংসদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বিরোধীদলকে রাজনৈতিক কৌশলগত পরামর্শ দিয়ে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী কেবল দল থেকে বহিষ্কার করলেই কোনো সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হয় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন, এক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সরাসরি প্রযোজ্য নয়, যদি না সংশ্লিষ্ট সদস্য নিজে পদত্যাগ করেন বা দল তাকে ফ্লোর ক্রসিংয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তার এই মন্তব্য বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, গাজী নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। এ কারণে বিরোধীদল ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টি উল্লেখ করে স্পিকার বা নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিলে তার সংসদীয় আসন শূন্য হতে পারে। তবে, তিনি বিরোধীদলের আপত্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবং তাদের নেতার প্রতি সম্মান জানিয়ে গাজী নজরুলকে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি থেকে বাদ দিতে সরকারের কোনো আপত্তি নেই বলেও জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য সরকারি দলের নমনীয়তা এবং একই সাথে সাংবিধানিক অবস্থান তুলে ধরে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে কিছুটা হাস্যরসের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানান বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দুর্বল মানুষকে জব্দ করতে গ্রামে যেমন মেম্বার নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার কথা প্রচলিত আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও মাঝে মধ্যে সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতে এমন কিছু ‘টিপস' দেন। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, গাজী নজরুল ইসলামকে এরই মধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাই তিনি দলের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে ফ্লোর ক্রসিং করেছেন—এ কথা নতুন করে বলার সুযোগ নেই। তবে, নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গাজী নজরুলকে সংসদীয় কমিটিতে না রাখার যে আবেদন জানানো হয়েছে, তা বিবেচনায় নেওয়ায় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবারও ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন, বিরোধী দলের অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে তারা গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখতে চান, তবে তাকে কোনো সংসদীয় কমিটিতে রাখতে চান না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন যে, সংবিধান অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলাম এখনও বৈধ সংসদ সদস্য। বিরোধী দল ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে কোনো পদক্ষেপ না নিলে তার সদস্যপদ বহাল থাকবে। তবে, বিরোধীদলীয় নেতার সম্মান ও ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকার কমিটির সদস্যপদ থেকে তাকে বাদ দিতে রাজি। এই বাকযুদ্ধ সংসদের কার্যপ্রণালী এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।