দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সরকার চারটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আজ বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়–সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি অনুমোদন লাভ করে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা এবং উচ্চমূল্য সত্ত্বেও দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছে সরকার। এই ক্রয়ের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ সংকট কিছুটা হলেও নিরসন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বৈঠক শেষে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরকারি ক্রয়–সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এই সিদ্ধান্ত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। এই এলএনজি জাহাজগুলো মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং শিল্প-কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করবে। এর ফলে শিল্প উৎপাদন সচল থাকবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এই চারটি জাহাজ এলএনজি সরবরাহ করবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত তিনটি প্রতিষ্ঠান: আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর, বিপি সিঙ্গাপুর এবং ভিটল এশিয়া। এই সরবরাহকারীরা আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছে। উল্লেখ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামা এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রতিটি জাহাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমান বাজারের অস্থির চিত্রকেই প্রতিফলিত করে।
প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন মেট্রিক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) এলএনজির দরের বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর তাদের দুটি কার্গোর মধ্যে একটির জন্য ২৭ দশমিক ৫৪ মার্কিন ডলার এবং অন্যটির জন্য ২৩ দশমিক ৯৮ মার্কিন ডলারের দর প্রস্তাব করেছে। অপরদিকে, বিপি সিঙ্গাপুর একটি জাহাজের জন্য ২৮ দশমিক শূন্য ৩ মার্কিন ডলার দর দিয়েছে, যা এই ক্রয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। ভিটল এশিয়া তাদের একটি জাহাজের জন্য ২৬ দশমিক ৬৬ মার্কিন ডলার দর প্রস্তাব করেছে। এই দরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের জটিলতা এবং অঞ্চলভিত্তিক মূল্যের তারতম্যকে নির্দেশ করে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে, এই এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়া সরকারি ক্রয়বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক দরপত্র পদ্ধতির মাধ্যমেই সম্পন্ন হচ্ছে। এই পদ্ধতি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করে, যদিও বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি সার্বিকভাবে মূল্যকে প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক বাজারের চলমান অস্থিরতা সত্ত্বেও দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এই ধরনের ক্রয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের সরবরাহ-সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে, যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং শিল্প খাতের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে, দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক কারখানা উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব পড়ছে।
এই তীব্র গ্যাস ঘাটতি মেটাতে সরকার আমদানি করা এলএনজির ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের কারণে এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজার অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এর ফলে একদিকে যেমন এলএনজির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, তেমনি প্রয়োজনীয় পরিমাণ এলএনজি সহজে ও সময়মতো পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
এমন প্রতিকূল বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতেও দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই উচ্চমূল্যে এলএনজি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি সরকারের একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ, যা স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সহায়ক হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের শিল্প উৎপাদন সচল রাখা, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং জনগণের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।