বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণ। এই উত্তরণ প্রক্রিয়াকে টেকসই ও স্থিতিশীল করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), কৃষি, ওষুধসহ বিভিন্ন শিল্পের জন্য খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা। তাঁরা মনে করেন, কেবল কর্মকৌশল গ্রহণ করলেই হবে না, বরং তার সঠিক বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকিও নিশ্চিত করা জরুরি। সোমবার (৩১ আগস্ট, ২০২৬) রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন ভবনে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় শিল্পোদ্যোক্তারা তাদের এই সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন।
এলডিসি উত্তরণের জন্য সংস্কার কার্যক্রমে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও সক্ষমতা বাড়াতে কর্মকৌশল নির্ধারণ বিষয়ক এই সভায় বক্তারা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, সহজ অর্থায়ন, লজিস্টিকস সাপোর্ট এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা একমত পোষণ করেন যে, এই বিষয়গুলো সমাধান করা না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি কঠিন হয়ে পড়বে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক সভায় সভাপতিত্ব করেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য যে তিন বছর বাড়তি সময় পাওয়া গেছে, সেটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সভার শুরুতে এফবিসিসিআইয়ের মহাসচিব মো. আলমগীর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার ওপর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন, যা উপস্থিত সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার ইউরোপে জিএসপি (জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস) ও ইবিএ (এভরিথিং বাট আর্মস)-এর মতো শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা হারানোর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এর পাশাপাশি ওষুধশিল্পসহ বিভিন্ন খাতের মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বিধিবিধানেও কড়াকড়ি আসবে, যা দেশের শিল্প খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এখনই প্রস্তুতি গ্রহণ করা অপরিহার্য।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা জোর দিয়ে বলেন যে, এলডিসি উত্তরণের কর্মকৌশল বাস্তবসম্মত না হলে তা কার্যকর সুফল বয়ে আনবে না। এ জন্য মাঠপর্যায় থেকে সঠিক তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করে খাতসমূহের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রয়োজনগুলো চিহ্নিত করার প্রস্তাব দেন তাঁরা। তাঁদের মতে, শুধুমাত্র শীর্ষস্থানীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং তৃণমূল পর্যায়ের চাহিদা ও বাস্তবতা বিবেচনা করে কৌশল প্রণয়ন করা উচিত।
ঢাকা চেম্বারের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর জোর দেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোকে সম্পূর্ণ কার্যকর করতে হবে, যা বাণিজ্য প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করবে। এসব পদক্ষেপ রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন গতি আনবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি শামীম আহমেদ দেশের প্লাস্টিকশিল্পের একটি বড় অংশ 'কপি' পণ্য তৈরি করে বলে উল্লেখ করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ওষুধশিল্পের মতো এই খাতের জন্যও মেধাস্বত্ব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এমন পরিস্থিতিতে প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশলসহ কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দ্রুত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শিল্পের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট (মেধাস্বত্ব অধিকার) নিয়ে বাংলাদেশ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে জানান বাংলাদেশ অ্যাগ্রো কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএমএ) সভাপতি কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ওষুধশিল্প, কৃষি এবং অ্যাগ্রো কেমিক্যাল খাত বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশ প্যাটেন্টের আওতাভুক্ত যেসব পণ্য উৎপাদন করে, দ্রুত সেগুলোর নিবন্ধন সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি, যা ভবিষ্যতের আইনি জটিলতা এড়াতে সাহায্য করবে।
মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান ও সংগঠনটির মহাসচিব মো. আলমগীর; সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রজেক্টের ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এক্সপার্ট নেছার আহমেদ, বিজিএমইএর পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মুস্তাফিজ, বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ রাশেদ, বিজেএমএর চেয়ারম্যান আবুল হোসেন, বিটিএমএর পরিচালক সাজিদ ইশরাক, বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সংগীতা আহমেদ, বাংলাদেশ বহুমুখী পাটজাত পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মো. রাশেদুল করিম মুন্নাসহ দেশের বিভিন্ন খাতের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। এই ব্যাপক অংশগ্রহণ এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ার প্রতি বেসরকারি খাতের গভীর আগ্রহ ও উদ্বেগের প্রতিফলন।