দীর্ঘদিন ধরে বিমা গ্রাহকদের অপরিশোধিত দাবি পরিশোধের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ৫২৩ জন গ্রাহককে মোট ৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। গত রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হয়, যা বিমা খাতে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও নিবিড় তত্ত্বাবধানে এই দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবির আংশিক নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে।
আইডিআরএ সূত্র অনুযায়ী, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সিকিউরিটি বন্ড নগদায়নের মাধ্যমে গ্রাহকদের বিমা দাবি পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হয়েছে। এরপর ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (বিইএফটিএন) পদ্ধতি ব্যবহার করে সরাসরি গ্রাহকদের নিজ নিজ ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে যে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে, যা অতীতের অনেক অভিযোগের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত জরুরি ছিল।
বাংলাদেশের বিমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কোম্পানির গ্রাহকদের বিমা দাবি অপরিশোধিত থাকার কারণে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতি বিমা শিল্পের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে, আইডিআরএ বকেয়া দাবি পরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, বিমা গ্রাহকদের ন্যায্য দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করাই তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও দায়িত্ব।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফের এই দাবি পরিশোধের মাধ্যমে আইডিআরএ'র সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তবে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সব বকেয়া দাবি এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। অবশিষ্ট দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে পরিশোধের লক্ষ্যে কার্যক্রম পুরোদমে চলমান রয়েছে। এসব দাবি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কোম্পানির অন্যান্য সম্পদ বিক্রিসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, যা গ্রাহকদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।
একই প্রক্রিয়ায় আগামী মাসে আরও সাতটি বিমা কোম্পানির দীর্ঘদিনের অপরিশোধিত দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইডিআরএ জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে এসব কোম্পানির গ্রাহকদের বকেয়া দাবিও পরিশোধ করা হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা এবং উপলব্ধ সম্পদ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে প্রতিটি দাবি ন্যায্যতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা যায়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে, গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষা, বিমা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটিয়ে জনআস্থা পুনরুদ্ধারে তাদের কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকবে। বিমা খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম এবং দাবি পরিশোধে বিলম্বের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে যে অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে, তা কমাতে নিয়মিতভাবে বকেয়া দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও আইডিআরএ দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছে।
এই পদক্ষেপগুলো কেবল ফারইস্ট ইসলামী লাইফের গ্রাহকদের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়, বরং সমগ্র বিমা শিল্পের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। এটি প্রমাণ করে যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা গ্রাহকদের অধিকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর এবং বিমা খাতকে একটি নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট। ভবিষ্যতে এ ধরনের পদক্ষেপ বিমা শিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার পুনর্গঠনে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।