সোমবার, 14 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
বাণিজ্য 🇧🇩 বাংলা

তামাক খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের যুগান্তকারী পরিকল্পনা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তামাক খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সাধারণ ভোক্তাদের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে, এনবিআর তামাক শিল্প থেকে অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের এক বিস্তারিত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি নির্ভর নজরদারি, অবৈধ উৎপাদন ও বিপণন রোধ, মূল্যস্তর বৃদ্ধি এবং তামাকপাতার প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষণ।

শেয়ার করুন:
তামাক খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের যুগান্তকারী পরিকল্পনা

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটীয় লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহে এনবিআর সম্ভাবনাময় তামাক খাতকে কৌশলগতভাবে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সংস্থাটি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর করের চাপ না বাড়িয়ে বরং তামাক শিল্প থেকে অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আদায়ের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এনবিআরের বাজেট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা (বিআইপি) সূত্রে জানা গেছে, তামাক খাত থেকে বাড়তি রাজস্ব আহরণের জন্য পাঁচ ধাপে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ পদ্ধতি প্রবর্তন ও অবৈধ উৎপাদন-বিপণন প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা। এছাড়াও, তামাকজাত পণ্যের মূল্যস্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা এবং তামাকপাতার প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণব্যবস্থা নিয়মিত পরিবীক্ষণের মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রায় ৬০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করে রাজস্ব ফাঁকি কমানোর সুনির্দিষ্ট উদ্যোগও এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।

বর্তমানে সরকার প্রতিবছর তামাক খাত থেকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে থাকে। এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করেন, এই খাতে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও কার্যকর নজরদারি করা গেলে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। দীর্ঘদিনের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার পর এবার এনবিআর তামাকসহ অন্যান্য বড় রাজস্ব সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর মাধ্যমে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইছে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যমান কাঠামোর দুর্বলতা দূর করে রাজস্ব সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করা।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে অত্যাধুনিক ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পদ্ধতিতে গণনা যন্ত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ক্যামেরা স্থাপন করে কারখানাগুলোকে স্বয়ংক্রিয় ও কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে, সিগারেটের স্ট্যাম্পে কিউআর (QR) ও এআর (AR) কোড ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যার মাধ্যমে উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পণ্যের গতিবিধি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এটি রাজস্ব ফাঁকি রোধে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

অবৈধ সিগারেট ও তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন এবং বিপণন শনাক্ত করতে এনবিআর একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ তৈরির পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকরা সহজেই অবৈধ সিগারেট বা তামাকজাত পণ্যের বিষয়ে রাজস্ব বোর্ডকে তথ্য জানাতে পারবেন। এছাড়া, ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস ব্যবস্থা বাস্তবায়নে সাহায্যকারী হুইসেলব্লোয়ার বা তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কারের বিধানও রাখা হবে, যা জনগণের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করবে এবং অবৈধ কার্যক্রম দমনে সহায়ক হবে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা তামাক খাতকে আরও জবাবদিহিমূলক করবে।

এনবিআরের পরিকল্পনায় তামাকজাত পণ্যের মূল্যস্তর বৃদ্ধিকেও বাড়তি রাজস্ব আদায়ের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূল্যস্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা একইসাথে তামাকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতেও ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি, তামাকপাতার প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আরও প্রায় ৬০০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ কমানোর উদ্যোগও এই পরিকল্পনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসির (বিএনটিটিপি) প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আগে সিগারেট খাত থেকে সনাতন পদ্ধতিতে কর আদায় করা হতো, কিন্তু এখন সেটি ডিজিটাল রূপ পাচ্ছে। তার মতে, তামাক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন উপায়ে কর ফাঁকি দেয়, যেমন পুরোনো সিগারেট নতুন দামে বিক্রি করা বা দামে কারসাজির মাধ্যমে। এসব ক্ষেত্রে তামাক কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি এবং এনবিআরের নতুন পরিকল্পনা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সামগ্রিকভাবে, এনবিআর-এর এই বহুমুখী পরিকল্পনা তামাক খাত থেকে রাজস্ব আদায়কে আধুনিক, স্বচ্ছ এবং আরও কার্যকর করতে সাহায্য করবে। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, কঠোর নজরদারি এবং নীতিগত পরিবর্তনগুলো কেবল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করবে না, বরং তামাকের অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই পদক্ষেপগুলো দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়নে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ