রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) মিলনায়তনে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালায় ব্যবসায়ীদের প্রতি ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও এর স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রমে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে পূর্ণাঙ্গ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা এবং কর প্রদানে বিদ্যমান নানা প্রতিবন্ধকতা এড়াতে এই সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট, ২০২৬) ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট, ট্যাক্স, শুল্ক আইন এবং ব্যক্তিগত ই-রিটার্ন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন ও পরিমার্জন’ শীর্ষক এই কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
কর্মশালার সূচনা বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ উল্লেখ করেন যে, বর্তমান অর্থবছরের বাজেটে সরকার মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর, কাস্টমস ডিউটি এবং ই-রিটার্ন ব্যবস্থায় বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তিত নীতিমালার সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করে ব্যবসা-বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার জন্য তিনি সকল উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান। একই সাথে, তিনি মত প্রকাশ করেন যে, কর প্রদানে বিদ্যমান জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো সফলভাবে কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) করের অবদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার প্রবর্তিত স্বয়ংক্রিয় রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল কার্যক্রম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পশ্চিম)-এর অতিরিক্ত কমিশনার নির্ঝর আহমেদ। তিনি তার বক্তব্যে দেশের উদ্যোক্তাদের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, ব্যবসায়ীরা তাদের রাজস্ব প্রদানের মাধ্যমে সরকারের সকল উন্নয়নমূলক কাজে অর্থের যোগান দিয়ে থাকেন। তাই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় তাদের অবদান অনস্বীকার্য। নির্ঝর আহমেদ আরও বলেন, ব্যবসায়ের সকল ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পরিবর্তিত নিয়মকানুন সম্পর্কে উদ্যোক্তাদের সর্বদা সচেতন ও অবগত থাকা প্রয়োজন।
এনবিআর অতিরিক্ত কমিশনার নির্ঝর আহমেদ কর্মশালায় বিস্তারিত তুলে ধরেন যে, সরকার চলতি বছরের বাজেটে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন (বিন) বাধ্যতামূলক করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়ন, ব্যাংক হিসাব চালু করা, এবং বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ ও নবায়নের মতো বিষয়গুলো। তিনি যেসব উদ্যোক্তার এখনও ভ্যাট নিবন্ধন নেই, তাদের অতিদ্রুত ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানান। এছাড়াও, তিনি ভ্যাট আইনের ৬৪ ধারা অনুযায়ী, প্রতি এক কর মেয়াদের পরিবর্তে তিন কর মেয়াদে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন, যা ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও গতিশীল করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নির্ঝর আহমেদ আরও জানান যে, ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আপিলের ক্ষেত্রে দাবি করা করের ১০ শতাংশ জমা দেওয়ার পূর্ববর্তী বিধানকে সংশোধন করেছে। এই সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, এখন আপিলাত ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে দাবি করা করের মাত্র এক শতাংশ এবং হাইকোর্টের ক্ষেত্রে দুই শতাংশ জমা দিলেই আপিল করা যাবে। এই পরিবর্তনকে তিনি অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন যে, এর ফলে ব্যবসায়িক ব্যয় অনেকাংশে হ্রাস পাবে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ আরও সহজ হবে, যা দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য অনুকূল হবে।
কর্মশালায় আয়কর এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এর ওপর দুটি পৃথক ও তথ্যবহুল সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই সেশনগুলোতে যথাক্রমে ঢাকা চেম্বারের কাস্টমস, ভ্যাট স্ট্যান্ডিং কমিটির অ্যাডভাইজর স্নেহাশীষ বড়ুয়া, এফসিএ এবং যুগ্ম-আহ্বায়ক মো. শফিকুল আলম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা প্রদান করেন। কর্মশালায় ঢাকা চেম্বারের সদস্যভুক্ত ১০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিগণ সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, যা ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের আগ্রহের প্রতিফলন। এ সময় ডিসিসিআইয়ের পরিচালক এম মোশাররফ হোসেন উপস্থিত ছিলেন এবং সার্বিক আয়োজনে সহযোগিতা করেন।
এই কর্মশালাটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে ডিজিটাল রূপান্তর এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকারের চলমান প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডিসিসিআই এবং এনবিআর-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই ধরনের কর্মসূচিগুলো উদ্যোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবর্তিত আইনি কাঠামোর সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন কর প্রদানে জটিলতা কমে, তেমনি অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রাজস্বের অবদানও বৃদ্ধি পায়, যা একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।