বুধবার, 26 আগস্ট 2026
⚠ ব্রেকিং
ফুটবল 🇧🇩 বাংলা

ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অফ গড' বল ৪২ কোটিতে বিক্রি: ফুটবলের বিতর্কিত স্মারক

১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিতর্কিত 'হ্যান্ড অফ গড' গোলের সেই ঐতিহাসিক বলটি এবার নিলামে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪২ কোটি টাকায়। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এই নিলামে বলটির চূড়ান্ত মূল্য দাঁড়ায় ২৫ লাখ পাউন্ড।

শেয়ার করুন:
ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অফ গড' বল ৪২ কোটিতে বিক্রি: ফুটবলের বিতর্কিত স্মারক

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত এবং স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী, দিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত 'হ্যান্ড অফ গড' গোলের সেই ঐতিহাসিক বলটি এবার নিলামে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪২ কোটি টাকায়। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের এই বলটি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এক নিলামে বিপুল অর্থের বিনিময়ে নতুন মালিক খুঁজে পেয়েছে। এই ঘটনা আবারও ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে সেই রোমাঞ্চকর ও বিতর্কিত ম্যাচের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যেখানে ম্যারাডোনার যাদুকরী পারফরম্যান্স ইতিহাস তৈরি করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের হেরিটেজ অকশনস গত শনিবার এই নিলামের আয়োজন করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, এই ঐতিহাসিক বলটির দাম সর্বোচ্চ ১ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৭৩ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে, শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা কম দামেই এটি বিক্রি হয়েছে। নিলামে বলটির চূড়ান্ত মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৩ লাখ মার্কিন ডলার, যা প্রায় ২৫ লাখ পাউন্ডের (৪১ কোটি ৮৫ লাখ ৭৩৫০০ টাকা) সমান। এর আগে ২০২২ সালে এই বলটি একবার নিলামে উঠেছিল, যা নিয়ে পরবর্তীতে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

নিলামে ওঠা বলটি ছিল অ্যাডিডাসের 'আজতেকা', যা ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে ব্যবহৃত হয়েছিল। ম্যাচের ৫১তম মিনিটে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে লড়াইয়ে ম্যারাডোনা মাথার বদলে হাত দিয়ে বল জালে পাঠান। এই গোলটি তিউনিসিয়ার রেফারি আলি বিন নাসের বৈধ ঘোষণা করায় তা ফুটবল বিশ্বে 'হ্যান্ড অফ গড' নামে পরিচিতি লাভ করে এবং ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। সেই মুহূর্তটি আজও ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

তবে, একই ম্যাচে ম্যারাডোনা শুধু বিতর্কিত গোলই করেননি, তিনি এমন একটি গোল করেছিলেন যা পরবর্তীতে 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি' নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে। নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একের পর এক ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে একক দক্ষতায় গোল করে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি তার ফুটবল প্রতিভার চরম নিদর্শন দেখান। তিনি পাঁচজন ইংলিশ আউটফিল্ড খেলোয়াড়কে ড্রিবল করে শেষে গোলরক্ষক শিলটনকেও পরাস্ত করে এই অসাধারণ গোলটি করেন, যা তাঁর সর্বকালের সেরা গোলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

ম্যারাডোনার এই দুই গোলের সুবাদে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে ম্যাচটি জিতে সেমিফাইনালে ওঠে এবং পরবর্তীতে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয় করে। ম্যাচের পর সেই ঐতিহাসিক বলটি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন ম্যাচের রেফারি আলি বিন নাসের। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই মূল্যবান স্মারকটি তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহেই ছিল। তার এই বল সংরক্ষণ নিঃসন্দেহে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা পরবর্তীতে এর নিলামের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে।

বলটির সত্যতা নিয়ে যাতে কোনো প্রশ্ন না ওঠে, সেজন্য বিন নাসের ২০২৩ সালে একটি চিঠিতে নিশ্চিত করেন যে, ১৯৮৬ সালের সেই ম্যাচে ব্যবহৃত একমাত্র বলটিই তাঁর কাছে আছে। পরবর্তীতে স্বাধীনভাবে করা পরীক্ষাতেও বলটির এই সত্যতা নিশ্চিত করা হয়। নিলামের আগে হেরিটেজ অকশনসের নিলাম বিশেষজ্ঞ মাইক প্রোভেনজালে বলটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন এবং এটিকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহযোগ্য সামগ্রীগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর মতে, এটি কেবল একটি বল নয়, এটি ফুটবলের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অংশ।

এটি অবশ্য বলটির প্রথম নিলাম নয়। এর আগে ২০২২ সালে আলি বিন নাসের নিজেই বলটি বিক্রি করেছিলেন ২৩ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলারে, যা সে সময় প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ডের সমান ছিল। পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সালে, নতুন মালিক আবার বলটি নিলামে তোলার চেষ্টা করেন, কিন্তু নির্ধারিত সর্বনিম্ন মূল্য পর্যন্ত কোনো দর না ওঠায় সেটি বিক্রি হয়নি। অবশেষে, ২০২৬ সালের এই নতুন নিলামে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা পাওয়া গেল এবং ৩৩ লাখ মার্কিন ডলার বা ২৫ লাখ পাউন্ডে ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অফ গড' গোলের সেই ঐতিহাসিক বলটি বিক্রি হলো। একই ম্যাচের ম্যারাডোনার পরা জার্সিও এর আগে ২০২২ সালে নিলামে উঠেছিল এবং সেটি রেকর্ড ৭১ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছিল, যা বলের দামের তুলনায় অনেকটাই বেশি।

ম্যারাডোনার এই বলের পুনরায় নিলাম এবং উচ্চ মূল্যে বিক্রি প্রমাণ করে যে, ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার স্মৃতিচিহ্ন এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি আজও বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে কতটা মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। এই বল কেবল একটি খেলার উপকরণ নয়, এটি একটি বিশেষ সময়ের প্রতীক যা ফুটবলের ইতিহাস, বিতর্ক এবং অবিস্মরণীয় প্রতিভাকে তুলে ধরে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ