ফুটবল বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ব্যালন ডি'অরের ২০২৬ সালের লড়াই ধীরে ধীরে চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে। আগামী ২৬ অক্টোবর এই পুরস্কার কার হাতে শোভা পাবে, তা নিয়ে ফুটবলপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের মধ্যে এখন থেকেই জোর আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেছে। সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকায় একাধিক তারকার নাম ঘুরেফিরে এলেও, লিওনেল মেসি, হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং লামিনে ইয়ামালের মতো খেলোয়াড়দের নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। এই উত্তপ্ত বিতর্কে এবার নিজের সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করেছেন জার্মান ফুটবলের কিংবদন্তি এবং বিশ্বকাপজয়ী তারকা লোথার ম্যাথাউস। তার পছন্দের নামটি হয়তো অনেককেই কিছুটা বিস্মিত করবে, কারণ তিনি মেসি, এমবাপ্পে কিংবা ইয়ামালকে পেছনে ফেলে হ্যারি কেইনকেই এবারের ব্যালন ডি'অরের সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
জার্মানির সাবেক এই মিডফিল্ডারের মতে, শুধুমাত্র কোনো একটি ম্যাচ, টুর্নামেন্ট বা কয়েকটি ঝলমলে মুহূর্ত দিয়ে নয়; বরং পুরো মৌসুমজুড়ে একজন খেলোয়াড়ের অবিচল ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই ব্যালন ডি'অর নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। এই বিচারেই ম্যাথাউস মনে করেন, হ্যারি কেইন অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছেন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে কেইনের সদ্য সমাপ্ত মৌসুমটিকে তিনি 'অসাধারণ' বলে অভিহিত করেছেন। ইংলিশ এই স্ট্রাইকারের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি তার নেতৃত্বে বায়ার্নের দুটি ঘরোয়া শিরোপা জয়ও তার পক্ষে একটি বড় যুক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে ম্যাথাউসের কাছে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরো মৌসুমে কেইনের পারফরম্যান্সে কোনো বড় ধরনের ছন্দপতন দেখা যায়নি।
ম্যাথাউসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মৌসুমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হ্যারি কেইন একই ধরনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। গোল করা এবং দলের আক্রমণভাগে তার নিয়মিত ও কার্যকরী প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। এই অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতাই তাকে ব্যালন ডি'অরের অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে দিয়েছে বলে ম্যাথাউস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। তিনি মনে করেন, একজন খেলোয়াড় যখন দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমানের খেলা উপহার দেন, তখনই তাকে প্রকৃত অর্থে সেরা বলা যায়। কেইন সেই মাপকাঠিতেই উত্তীর্ণ হয়েছেন, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
তবে কেইনের সঙ্গে বর্তমান ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসির তুলনা এড়ানো সম্ভব নয়। আর্জেন্টাইন এই জাদুকরও এবারের ব্যালন ডি'অরের আলোচনায় রয়েছেন। ইন্টার মিয়ামির হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লিগ জয়ের পাশাপাশি বিশ্বকাপে তার অনবদ্য পারফরম্যান্স এবং গোলসংখ্যা ম্যাথাউসের আলোচনায় উঠে এসেছে। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে জার্মান কিংবদন্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মান ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর সঙ্গে তুলনীয় নয়। তাই মেসির লিগ পারফরম্যান্সকে ইউরোপের বড় লিগে খেলা ফুটবলারদের পারফরম্যান্সের সঙ্গে একইভাবে মূল্যায়ন করা সমীচীন নয়। এছাড়াও, বিশ্বকাপে মেসির দুটি পেনাল্টি মিস করার বিষয়টিও ম্যাথাউসের বিশ্লেষণে স্থান পেয়েছে, যদিও মেসির সামগ্রিক পারফরম্যান্স যে অসাধারণ ছিল, সেটি তিনি অস্বীকার করেননি।
তরুণ প্রতিভাবান লামিনে ইয়ামালকেও ম্যাথাউস ব্যালন ডি'অরের অন্যতম আলোচিত প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা জেতা এবং পরবর্তীতে স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব ইয়ামালের পক্ষে বড় যুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু শুধুমাত্র দলীয় সাফল্যের ভিত্তিতে তাকে ব্যালন ডি'অরের সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার হিসেবে এগিয়ে রাখতে নারাজ ম্যাথাউস। তার মতে, ইয়ামাল নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত খেললেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে এমন বিশাল ব্যবধান তৈরি করতে পারেননি, যা তাকে বাকি প্রার্থীদের থেকে পরিষ্কারভাবে এগিয়ে দেবে। কিলিয়ান এমবাপ্পের ক্ষেত্রেও ম্যাথাউস একই ধরনের হিসাব করেছেন। ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার কৃতিত্ব এমবাপ্পের থাকলেও, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে বড় কোনো শিরোপা জিততে না পারাটা তার প্রার্থিতায় কিছুটা প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন জার্মান কিংবদন্তি।
জুদ বেলিংহামের ক্ষেত্রেও ম্যাথাউস একই যুক্তি দিয়েছেন। ইংলিশ এই মিডফিল্ডার ব্যক্তিগতভাবে আলো ছড়ালেও, দলীয় সাফল্য এবং পুরো মৌসুমের ধারাবাহিকতার বিচারে তিনি কেইনের চেয়ে এগিয়ে রাখতে পারছেন না। তবে হ্যারি কেইনের প্রার্থিতার কিছু দুর্বলতাও স্বীকার করেছেন ম্যাথাউস। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হিসেবে তিনি বিশ্বকাপের ফাইনালে দলকে নিয়ে যেতে পারেননি। একইভাবে, বায়ার্ন মিউনিখকে নিয়েও চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে পৌঁছাতে পারেননি। ব্যালন ডি'অরের মতো পুরস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মঞ্চে পারফরম্যান্স এবং দলকে সাফল্য এনে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, এটি কেইনের বিরুদ্ধে একটি বড় যুক্তি হতে পারে।
কিন্তু ম্যাথাউসের কাছে এই দুর্বলতাগুলোও কেইনকে তার পছন্দের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তার মতে, বড় দুটি ফাইনালে না ওঠার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, পুরো মৌসুমে হ্যারি কেইনের অসাধারণ ধারাবাহিকতা এবং তার খেলার সামগ্রিক প্রভাব এতটাই বেশি ছিল যে, তা এই সীমাবদ্ধতাগুলোকে ছাপিয়ে যায়। ম্যাথাউস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, কেইনের সামগ্রিক এবং অবিচ্ছিন্ন পারফরম্যান্সই তাকে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি'অর জয়ের সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই জার্মান কিংবদন্তির মতামত নিঃসন্দেহে ব্যালন ডি'অর বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনা আরও উসকে দিয়েছে।