ফুটবল মৌসুমের আনুষ্ঠানিক সূচনালগ্নেই নিজেদের অপ্রতিরোধ্য শক্তির জানান দিল আর্সেনাল। কার্ডিফের প্রিন্সিপালিটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এফএ কমিউনিটি শিল্ডের রোমাঞ্চকর ফাইনালে ঐতিহ্যবাহী প্রতিপক্ষ ম্যানচেস্টার সিটিকে ৩-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে শিরোপা জয় করেছে মিকেল আরতেতার দল। এই জয় গানারদের জন্য শুধু মৌসুমের প্রথম ট্রফিই এনে দেয়নি, বরং আসন্ন প্রিমিয়ার লিগ ও অন্যান্য টুর্নামেন্টের জন্য এক আত্মবিশ্বাসী বার্তা প্রদান করেছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের সফল কোচ পেপ গার্দিওলার প্রস্থানের পর ম্যানচেস্টার সিটির নতুন কোচ এনজো মারেসকার প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের অভিষেকটি স্মরণীয় হয়ে রইলো এক হতাশাজনক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্সেনাল ছিল আক্রমণাত্মক মেজাজে, যা সিটির রক্ষণভাগকে মুহূর্তের জন্যেও স্বস্তি দেয়নি। খেলার প্রথম মিনিটেই, ঠিক ২৩ সেকেন্ডের মাথায়, আর্সেনালকে এগিয়ে দেন রিকার্ডো কালাফিওরি। তরুণ মাইলস লুইস-স্কেলির নিখুঁত পাস থেকে সিটির সুসংগঠিত রক্ষণ ভেঙে বল জালে জড়ান তিনি। এটি ১৯৬৮ সালের পর কমিউনিটি শিল্ডের ইতিহাসে দ্রুততম গোল হিসেবে রেকর্ড বুকে জায়গা করে নিয়েছে, যা সিটির নতুন কোচ এবং খেলোয়াড়দের জন্য ছিল এক অপ্রত্যাশিত ধাক্কা। এই দ্রুতগতির গোল ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয় এবং আর্সেনালকে শুরুতেই মানসিকভাবে এগিয়ে রাখে।
প্রথম গোলের পর আর্সেনাল আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে এবং তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবলের ধারা বজায় রাখে। ম্যাচের ২৭তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় কাই হাভার্টজ। অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডের চমৎকার ক্রস থেকে ক্রিস্তোস জোলিসের হেড পাস ধরে দারুণ হেডে বল জালে পাঠান এই জার্মান তারকা। আর্সেনালের এই দুটি গোলই প্রথমার্ধে আসে, যা বিরতিতে যাওয়ার আগেই তাদের ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেয় এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে তাদের হাতে তুলে দেয়। সিটির খেলোয়াড়রা এই সময়ে নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারেননি এবং আর্সেনালের ছন্দবদ্ধ আক্রমণের মুখে বারবার খেই হারিয়েছেন।
বিরতির পরেও আর্সেনালের দাপট অব্যাহত থাকে। দ্বিতীয় অর্ধে মাত্র তিন মিনিটের মাথায়, অর্থাৎ ম্যাচের ৪৮তম মিনিটে, আর্সেনালের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড নিজেই দলের পক্ষে তৃতীয় গোলটি করে সিটির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেন। সিটির ডিফেন্সকে বিভ্রান্ত করে তিনি ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠান, যা আর্সেনালের ৩-০ গোলের জয় নিশ্চিত করে। এই গোল ম্যানচেস্টার সিটির ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ আশাটুকুও নিভিয়ে দেয় এবং আর্সেনালের জন্য এক ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে। ম্যাচ জুড়ে আর্সেনালের খেলোয়াড়রা অসাধারণ বোঝাপড়া এবং দলীয় সংহতি প্রদর্শন করেন, যা তাদের এই দাপুটে জয়ের মূল কারণ।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে আর্সেনাল তাদের ১৮তম কমিউনিটি শিল্ড শিরোপা ঘরে তুলল। এই ট্রফি জয়ের দিক থেকে উত্তর লন্ডনের ক্লাবটির চেয়ে এগিয়ে আছে কেবল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, যারা ২১ বার এই মৌসুমের প্রথম ট্রফিটি জিতেছে। কার্ডিফের প্রিন্সিপালিটি স্টেডিয়ামে আর্সেনালের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স নতুন মৌসুমের শুরুতেই তাদের শক্তিমত্তা এবং শিরোপা জয়ের আকাঙ্ক্ষার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। মিকেল আরতেতার সুপরিকল্পিত কৌশল এবং খেলোয়াড়দের মাঠে তার সঠিক বাস্তবায়ন ছিল এই জয়ের মূল ভিত্তি।
এই ম্যাচে গানারদের নতুন মুখদের পারফরম্যান্স ছিল বিশেষভাবে নজরকাড়া। ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ডের ব্রুনো গিমারাইস এবং ৩৪ মিলিয়ন পাউন্ডের গ্রিক উইঙ্গার ক্রিস্তোস জোলিস উভয়ই চমৎকার পারফর্ম করেছেন। বিশেষ করে জোলিস, যিনি দুইটি গোলেই সরাসরি অবদান রেখে নিজের মূল্য প্রমাণ করেছেন। তার গতি, ড্রিবলিং এবং নিখুঁত পাসিং আর্সেনালের আক্রমণভাগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অন্যদিকে, ম্যানচেস্টার সিটির দিক থেকে হতাশা ছিল সুস্পষ্ট। ১১৬ মিলিয়ন পাউন্ডের নতুন খেলোয়াড় এলিয়ট অ্যান্ডারসন এবং দলের তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হল্যান্ড—উভয়েই নিজেদের ছায়া হয়ে ছিলেন, ম্যাচের কোনো অংশেই তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি।
ম্যানচেস্টার সিটির জন্য এই পরাজয় ছিল এক কঠিন শিক্ষা। পেপ গার্দিওলার প্রস্থানের পর নতুন কোচ এনজো মারেসকার অধীনে এটি ছিল তাদের প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ এবং এই পরাজয় নতুন মৌসুমের শুরুতেই তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করবে। দলের তারকা খেলোয়াড়দের নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স এবং রক্ষণভাগের দুর্বলতা মারেসকাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। অন্যদিকে, আর্সেনালের এই বিজয় তাদের আসন্ন প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয়ের স্বপ্নে নতুন জ্বালানি যোগ করবে। এই জয় প্রমাণ করে যে, আর্সেনাল এই মৌসুমে একটি শক্তিশালী দল এবং তারা যেকোনো প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত।