আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসির ৬৮ বছর বয়সে পরলোকগমনে ফুটবল বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গত শনিবার আর্জেন্টিনার রোজারিওতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হোর্হে মেসি। তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা শোক প্রকাশ করেছেন এবং কিংবদন্তি মেসির প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। এই কঠিন সময়ে মেসির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তার সাবেক সতীর্থ নেইমার এবং দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, যারা তাদের হৃদয়স্পর্শী বার্তার মাধ্যমে ফুটবলের মানবিক দিকটি তুলে ধরেছেন।
হোর্হে মেসি শুধু লিওনেল মেসির বাবা ছিলেন না, তিনি ছিলেন তার দীর্ঘ ফুটবল যাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছোটবেলা থেকেই ছেলের প্রতিভা বিকাশে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। লিওনেল যখন বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমিতে যোগ দেন, তখন তার পাশে ছায়ার মতো ছিলেন হোর্হে। পরবর্তীতে তিনি মেসির এজেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, ছেলের ক্যারিয়ারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে তিনি ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক এবং অবিচল সমর্থক। তার দূরদর্শিতা এবং আত্মত্যাগই লিওনেল মেসিকে আজকের বিশ্বসেরা ফুটবলারে পরিণত করতে সহায়তা করেছে বলে মনে করেন অনেকেই।
বাবার মৃত্যুর পর লিওনেল মেসি এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যা বিশ্বজুড়ে লাখো ভক্তের হৃদয় ছুঁয়েছে। বুধবার প্রকাশিত সেই পোস্টে মেসি তার বাবার সঙ্গে কাটানো অমূল্য মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, এখনও তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তার বাবা আর নেই। বাবার আকস্মিক প্রয়াণ তাকে কতটা গভীরভাবে ব্যথিত করেছে, সেই কষ্টের কথা অকপটে তুলে ধরেন আর্জেন্টাইন তারকা। মেসির ভাষায়, তিনি আশা করেছিলেন তার বাবা আরও কিছুদিন বেঁচে থাকবেন এবং একসঙ্গে আরও অনেক কিছু উপভোগ করবেন।
মেসির এই মর্মস্পর্শী পোস্টে মন্তব্য করে ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার তার গভীর সমবেদনা জানান। পিএসজিতে মেসির সাবেক এই সতীর্থ লেখেন, ‘তোমার ও তোমার পরিবারের জন্য অনেক শক্তি কামনা করছি। বড় একটি আলিঙ্গন।' নেইমারের এই বার্তা মেসি পরিবারের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ক্লাবের ভিন্নতা ভুলে ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তে এমন সংহতি ফুটবলের চিরন্তন মূল্যবোধকেই তুলে ধরে। তাদের বন্ধুত্ব এবং একে অপরের প্রতি সমর্থন ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছে।
নেইমারের মতো পর্তুগিজ কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও মেসিকে সমবেদনা জানাতে পিছিয়ে থাকেননি। দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তাদের সম্পর্ক সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, ব্যক্তিগত এই দুঃসময়ে রোনালদো দেখিয়েছেন তার মানবিক দিক। মেসির পোস্টে মন্তব্য করে পর্তুগিজ তারকা লেখেন, ‘এই কঠিন সময়ে তোমার ও তোমার পরিবারের জন্য বড় একটি আলিঙ্গন। অনেক শক্তি, লিও।' বিশ্বের সেরা দুই ফুটবলারের এমন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি ক্রীড়াজগতের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
মেসি তার বাবার শেষ ইচ্ছার কথাও তুলে ধরেছেন। হোর্হে মেসি চেয়েছিলেন ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও ছেলেকে মাঠে খেলতে দেখতে। এই স্বপ্ন পূরণের আগেই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। মেসি জানিয়েছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক দিন আগে তার বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। সেই সময়ও মেসি আশা করেছিলেন, তার বাবা সুস্থ হয়ে অন্তত বিশ্বকাপের শেষ দিকে সেখানে উপস্থিত হতে পারবেন এবং ছেলের খেলা উপভোগ করবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই আশা আর পূরণ হলো না।
বাবার প্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত লিওনেল মেসি এখন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তবে নেইমার এবং রোনালদোর মতো সতীর্থ ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে পাওয়া এই হৃদয়স্পর্শী বার্তাগুলো তাকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফুটবলের এই দুই মহাতারকার সহানুভূতি শুধু মেসির ব্যক্তিগত শোককে নয়, বরং ক্রীড়াজগতের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। হোর্হে মেসির চলে যাওয়া ফুটবল বিশ্বের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি, তবে তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার লিওনেল মেসির মাধ্যমে চিরকাল অম্লান থাকবে।