বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগকে ঘিরে বর্তমানে এক গভীর সংকট ও তুমুল বিতর্ক চলছে। অভিযোগ উঠেছে যে, এসব বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধিমালার গুরুতর ব্যত্যয় ঘটানো হচ্ছে। যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে খ্যাতিসম্পন্ন ও অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের নিয়োগের বিধান রয়েছে, সেখানে সম্প্রতি ভিন্ন একাডেমিক পটভূমির শিক্ষকদের, এমনকি আরবি সাহিত্য ও ইসলামি শিক্ষার অধ্যাপকদেরও গুরুত্বপূর্ণ এই পদে বসানো হয়েছে। এই ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, যা দেশের উচ্চশিক্ষার মান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, ভিসি নিয়োগে এই ধরনের আইন লঙ্ঘন মূলত চরম দলীয়করণের ফল। তারা বলছেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যারা অনেক ক্ষেত্রে পূর্বে বিভাগীয় সভাপতির মতো সাধারণ প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করেননি। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে এবং বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের স্বকীয়তা নষ্ট করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনা করে এই বিতর্কিত নিয়োগগুলোর চিত্র স্পষ্ট হয়েছে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবকেই নির্দেশ করে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. জাকির হোসাইন, যিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে স্বনামধন্য একজন শিক্ষাবিদকে উপাচার্য নিয়োগের সুস্পষ্ট আইনি বিধান থাকা সত্ত্বেও, আরবি ও ইসলামি শিক্ষার একজন শিক্ষককে এই পদে বসানো হয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চরিত্র ও তার একাডেমিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একইভাবে, গাজীপুর ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বাংলাদেশের (ইউএফটিবি) উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোক্তার আলী। ইউএফটিবি-এর আইন অনুযায়ী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে খ্যাতিসম্পন্ন এবং প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা। মার্কেটিংয়ের মতো ভিন্ন একটি বিষয়ের অধ্যাপককে এই পদে নিয়োগ দেওয়ায় আইনি বিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই দুটি ঘটনা দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা নির্দেশ করে, যেখানে একাডেমিক যোগ্যতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত প্রকৃতিকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
শুধু এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের আরও কয়েকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগেও একই ধরনের যোগ্যতা উপেক্ষা করার অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক। যদিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ কাউকে উপাচার্য নিয়োগে সরাসরি বাধা নেই, তবুও তার একাডেমিক বিশেষত্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। অনুরূপভাবে, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভিপ্রবি) উপাচার্য করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলামকে, যা আবারও বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আবার নিয়োগ কমিটি আইনগত ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খাইরুল ইসলামকে। আবার পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছবিরুল ইসলাম হাওলাদার, যিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইনে উপাচার্য নিয়োগে বিশেষ যোগ্যতার উল্লেখ না থাকার কারণে ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি অনিবার্য, যা শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত মান নিশ্চিত করে।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনি সংকেত বয়ে আনছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় আইনগুলোতে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত রাখার মূল উদ্দেশ্যই হলো সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার প্রকৃতি বজায় রাখা এবং তার লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করা। বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়া সেই উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিতে পারে। তাই, এই বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, আইনি বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং প্রকৃত যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া অপরিহার্য, যাতে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।