বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল আজ রবিবার এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আজ সকালে উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানকে কঠোর নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। দুপুরের দিকে মামলার শুনানিতে তার আইনজীবীরা জামিনের আবেদন জানান। তবে, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সাইফুর রহমানের জামিনের তীব্র বিরোধিতা করেন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের গুরুত্ব এবং তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জামিন না মঞ্জুরের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনাল জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে সাইফুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই আদেশের ফলে ইলিয়াস আলী গুম মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হলো।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর রহস্যজনক গুমের ঘটনায় উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই মামলার তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তদন্তকারী সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পেছনের রহস্য উন্মোচনে কাজ করছে এবং সাইফুর রহমানের গ্রেপ্তার সেই প্রচেষ্টারই ফল। এই ধরনের একটি স্পর্শকাতর মামলায় একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার নাম উঠে আসা ঘটনাটিকে আরও জটিল ও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একই সঙ্গে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৫ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন। এই তারিখের মধ্যে তদন্তকারী সংস্থাকে সাইফুর রহমান এবং অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত সকল তথ্য-প্রমাণ সংবলিত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে জমা দিতে হবে। এই প্রতিবেদন মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, এই মামলার অপর আসামি, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, ইতিপূর্বে এই একই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তার গ্রেপ্তার এবং বর্তমান উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানের গ্রেপ্তারের ঘটনা ইলিয়াস আলী গুম মামলার তদন্তে একটি ধারাবাহিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলার সকল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে বদ্ধপরিকর বলে বারবার জানিয়েছে।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গভীর রাতে রাজধানীর বনানী থেকে নিখোঁজ হন তৎকালীন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক আনসার আলী। তাদের গাড়িটি বনানীর একটি সড়কের পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর থেকে ইলিয়াস আলী এবং তার গাড়িচালকের কোনো খোঁজ মেলেনি। এই ঘটনা তৎকালীন সময়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উত্তেজনার জন্ম দেয়। বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরই অভিযোগ করা হয়েছে যে, এটি একটি পরিকল্পিত গুমের ঘটনা।
ইলিয়াস আলীর গুমের পর থেকে তার পরিবার ও দলের নেতাকর্মীরা তার সন্ধান দাবিতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এই দীর্ঘ দশ বছর ধরে তার পরিবার বিচার ও ন্যায়বিচারের আশায় অপেক্ষায় রয়েছে। উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে মামলার তদন্তে নতুন আলোর রেখা দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। আদালত ও তদন্তকারী সংস্থা উভয়ের উপরই এখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব বর্তেছে।
এই মামলার পরবর্তী শুনানি এবং তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য নির্ধারিত ২৫ অক্টোবর তারিখটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আশা করা হচ্ছে, তদন্ত সংস্থা এই সময়ের মধ্যে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবে, যা ইলিয়াস আলী গুমের রহস্য উন্মোচনে এবং জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করতে সহায়ক হবে। পুরো জাতি এই মামলার দিকে গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হওয়ার প্রত্যাশায়।