রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা এবং তাদের দুই সন্তান আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী ও আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সিদ্ধার্থ (২০) এবং মুগ্ধ (২৩) নামের দুই যুবককে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রোববার (২৩ আগস্ট, ২০২৬) ভোরে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয় এবং দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে মহানগর পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার (২২ আগস্ট) দিনগত রাতে গণপতি চক্রবর্তীর নিজস্ব দোতলা বাড়ি থেকে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় তার বাড়ির ছাদে, স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা ও মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থীর মরদেহ পড়ে ছিল ছাদে ওঠার সিঁড়িতে, আর ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয় খাটের নিচ থেকে। স্থানীয়রা জানায়, বেশ কিছুদিন ধরে বাড়িটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল এবং গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে পরিবারের সদস্যদের প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। শনিবার রাত নয়টার দিকে ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ টের পেয়ে স্থানীয়দের মনে সন্দেহ জাগে। পরে গণপতি চক্রবর্তীর অন্য স্বজন ও পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ তালা ভেঙে ওই চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে। এসময় বাসার ভেতরে জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় ছিল, যা লুটের ইঙ্গিত দেয়।
চারটি হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্তে নামে এবং দ্রুততার সাথে অভিযান শুরু করে। অভিযানের একপর্যায়ে নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়। রোববার দুপুরে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে এবং এর পেছনের কারণও জানিয়েছে। পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, এই ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা বা এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কিনা, সে বিষয়েও বিস্তারিত তদন্ত চলছে।
পুলিশ কমিশনারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটককৃত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে যে, গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) শেষ রাতের দিকে তারা গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে বসে মাদক সেবন ও আড্ডা দিচ্ছিল। তারা প্রায়ই এই কাজটি করত। ওইদিন তাদের মাদক সেবনের দৃশ্য দেখে ফেলেন গণপতি চক্রবর্তী। এ ঘটনায় তিনি প্রতিবাদ করলে প্রথমে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বেরিয়ে আসলে তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
এরপর একে একে পরিবারের আরও সদস্যরা বেরিয়ে আসেন। প্রীতিলতা চক্রবর্তীর হত্যার পর তাদের মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী বেরিয়ে এলে তাকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। সবশেষে ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম তাদের চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করতে দ্বিধা করেনি ঘাতকরা। একটির পর একটি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার পর, ঘাতকরা বাড়িতে ঢুকে স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে পালিয়ে যায়। এই লোমহর্ষক ঘটনায় পুরো রংপুরজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নিহত গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল রংপুর জিলা স্কুলের একজন সম্মানিত শিক্ষক ছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন। তার মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী কারমাইকেল কলেজের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং মাস্টার্স সম্পন্ন করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আর তার ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তো। এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত পরিবারের এমন নির্মম পরিণতি স্থানীয়দের স্তম্ভিত করেছে।
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী গণমাধ্যমকে জানান, সবশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে মুঠোফোনে তাদের সঙ্গে কথা হয়। এরপর শনিবার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে পরিবারের সব ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফোনে কাউকে না পেয়ে রাত নয়টার দিকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর ওই বাড়িতে যান তিনি। সেখানে পৌঁছে দেখেন প্রধান গেট বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। পরে ৯৯৯-এ কল দিলে সেখান থেকে কোতোয়ালি থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। এসময় বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল বলে তিনি জানান, যা সন্দেহ আরও গভীর করে তোলে।
খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা আলামত সংগ্রহসহ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে তৎপরতা শুরু করে। পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, তারা আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা চক্রের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে নিহতদের পরিবার ও স্থানীয়রা।