ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের গোলজারমন্ডলের ডাঙ্গীর আক্কাচ আলীর মোড় এলাকায় মাদক সেবন ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার রাতে সংঘটিত এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছে থানা পুলিশ। উত্তেজিত জনতা পুলিশের ব্যবহৃত একটি পিকআপভ্যান ভাঙচুর করেছে, যা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনায় গুরুতর আহত দুজনকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের চিকিৎসা চলছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই সংঘাতের সূত্রপাত হয় গত ১৪ আগস্ট। ওইদিন গোলজার মন্ডলের ডাঙ্গী এলাকায় স্থানীয় যুবক শাকিল ও তার কয়েকজন বন্ধু ইয়াবা সেবন করেন। এই দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করেন ওমান প্রবাসী টুলু মিয়া এবং সুমনসহ তার তিন-চারজন সহযোগী। পরবর্তীতে টুলু মিয়া ও তার দল এই ভিডিও দেখিয়ে শাকিলের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন, যা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং সংঘাতের বীজ বপন হয়।
টাকা দাবির এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শাকিলের লোকজন টুলু মিয়াকে টাকা নেওয়ার জন্য ঘটনাস্থলে আসতে বলেন। টুলু মিয়া সেখানে পৌঁছানো মাত্রই শাকিলের পক্ষ তাকে মারধর করে এবং একপর্যায়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে টুলু মিয়াকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে থানায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় বিষয়টি মীমাংসা করে টুলু মিয়াকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপ সাময়িকভাবে পরিস্থিতি শান্ত করলেও, দুই পক্ষের মধ্যেকার ক্ষোভ ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব ভেতরে ভেতরে জিইয়ে ছিল।
পূর্বের ঘটনার জের ধরে গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে টুলু মিয়া পার্শ্ববর্তী মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে আনুমানিক ১৫-২০টি মোটরসাইকেলে চড়ে লোকবল নিয়ে গোলজার মন্ডলের ডাঙ্গী ও আক্কাচ আলীর মোড়ে মহড়া দেন। এ সময় তারা আগের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট স্থানীয় মুদি দোকানি বক্কার শিকদার এবং মান্নান নামের দুই ব্যক্তিকে মারধর করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এই ঘটনা বক্কার শিকদারের পক্ষের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে এবং প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে।
বক্কার শিকদারের পক্ষের মধ্যে এই মারধরের ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তারা চরমভাবে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। টুলু মিয়াকে ঘটনাস্থলে না পেয়ে তারা ক্ষোভের বশে তার বাবা রাজা মিয়া (৭০) এবং স্থানীয় জয়নাল শিকদার (৬৫) নামের দুই বৃদ্ধকে মারধর করে। একপর্যায়ে কয়েকশ উত্তেজিত জনতা গুরুতর আহত অবস্থায় এই দুজনকে জিম্মি করে রাখে, যা এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়।
এই সংবাদের ভিত্তিতে থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আহত রাজা মিয়া ও জয়নালকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু স্থানীয় উত্তেজিত জনতা পুলিশকে বাধা দেয় এবং একপর্যায়ে পুলিশের গাড়িতে হামলা চালিয়ে গাড়ির পর্দা ছিঁড়ে ফেলে ও গাড়ির চাবি ছিনিয়ে নেয়। উত্তেজিত জনতার এই হামলায় পুলিশের পিকআপভ্যানটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা পুলিশের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য এবং কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর আহত রাজা মিয়া ও জয়নালকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে বক্কার শিকদার ও টুলু মিয়ার মোবাইল বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় মিন্টু মৃধা নামের এক ব্যক্তি জানান, টুলু মিয়া ওমানে থাকলেও মাঝেমধ্যে দেশে এসে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, টুলু মিয়া শুক্রবারের ঘটনা ঘটিয়ে শনিবার সকাল ১০টার ফ্লাইটে আবার ওমান চলে গেছেন।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহামুদুল হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, স্থানীয় আধিপত্য, মাদকসহ নানাবিধ বিষয়ের জেরে দুটি পক্ষের মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে। তিনি জানান, এ সময় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে পিকআপভ্যান ভাঙচুর করা হয়েছে, যার ফলে গাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে দু'পক্ষের কেউ এখন পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের করেননি এবং এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনা এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।