গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরসাদী ইউনিয়নের বাশাইর বণিকপাড়া এলাকায় একটি বহুল প্রতীক্ষিত ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই এর দেওয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে, এমনকি কিছু অংশ ধসেও পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের বর্ষার জলাবদ্ধতা ও বর্জ্যের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। তবে নির্মাণাধীন কাঠামোর এমন বেহাল দশা দেখে এলাকার মানুষের মধ্যে স্বস্তির বদলে এখন গভীর শঙ্কা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ড্রেনের বিভিন্ন অংশে স্পষ্ট ফাটলের চিহ্ন বিদ্যমান। একটি উল্লেখযোগ্য অংশে দেয়াল ধসে পড়েছে এবং ধসে পড়া কাঠামোকে সাময়িকভাবে ধরে রাখার জন্য দুই পাশের দেয়ালের মাঝখানে কাঠের তক্তা বসানো হয়েছে। এই দৃশ্য নির্মাণকাজের মান এবং ব্যবহৃত উপকরণের দৃঢ়তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সিমেন্ট ও বালির মিশ্রণসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে যথাযথ মান অনুসরণ করা হয়নি, যা এই দ্রুত ফাটল ও ধসের মূল কারণ হতে পারে।
বাশাইর বণিকপাড়ার এই ড্রেনটি বাশাইর মূল সড়কের পাশের ড্রেনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, যা এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় এই প্রকল্পের জন্য মোট ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই বরাদ্দ তিন দফায় এসেছে: প্রথম দফায় চার লাখ, দ্বিতীয় দফায় চার লাখ এবং তৃতীয় দফায় দুই লাখ টাকা। স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঐচ্ছিক প্রকল্প হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় এই কাজটি তত্ত্বাবধান করছে।
প্রকল্পের এমন বেহাল দশা সম্পর্কে জানতে চাইলে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবুল কালাম আজাদ জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ড্রেন নির্মাণের প্রায় ১০ থেকে ১৫ ফুট অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত ১০ আগস্ট তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং প্রকল্পের সভাপতিকে ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি সঠিকভাবে পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। তার দাবি, দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান করা হবে এবং গুণগত মান বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করা হবে।
এদিকে, প্রকল্পের সভাপতি ও বাহাদুরসাদী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ইউপি সদস্য শওকত আলী তার বক্তব্যে বৃষ্টির কারণে ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে দুই থেকে তিন হাত জায়গা ভেঙে পড়েছিল, তবে সেটি ইতিমধ্যেই সংস্কার করা হয়েছে। তার দাবি, পিআইও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সব ঠিক আছে বলে জানিয়েছেন এবং বর্তমানে কোনো সমস্যা নেই। তার এই বক্তব্যে স্থানীয়দের অভিযোগ এবং সরেজমিনের চিত্র কিছুটা ভিন্নতা আনছে।
এই পুরো বিষয়টি নিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ. টি. এম. কামরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, পিআইওকে কাজটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে সঠিকভাবে যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হওয়ার পরেই যেন বিল পরিশোধ করা হয়, সে বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের এমন ভঙ্গুর দশা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে। বর্ষার পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত ড্রেনই যদি নির্মাণাধীন অবস্থায় ভেঙে পড়ে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কর্তৃপক্ষ দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করবে এবং জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।