শুক্রবার, 10 জুলাই 2026
⚠ ব্রেকিং
AI 🇧🇩 বাংলা

গণিতের ভয়ংকর পূর্বাভাস: মানবজাতির আয়ু আর মাত্র ১৭,১০০ বছর?

জলবায়ু পরিবর্তন বা পারমাণবিক যুদ্ধের মতো প্রচলিত উদ্বেগের বাইরে গিয়ে একদল গণিতবিদ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক তত্ত্বের মাধ্যমে মানবজাতির বিলুপ্তির এক চমকপ্রদ পূর্বাভাস দিয়েছেন। তাদের গাণিতিক হিসাবে, এই পৃথিবীতে মানবজাতি হয়তো আর সর্বোচ্চ ১৭,১০০ বছর টিকে থাকবে, যার সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ।

শেয়ার করুন:
গণিতের ভয়ংকর পূর্বাভাস: মানবজাতির আয়ু আর মাত্র ১৭,১০০ বছর?

পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, অজানা মহামারি বা পারমাণবিক যুদ্ধের মতো সম্ভাব্য মহাবিপর্যয়ের খবর প্রায়শই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানবজাতির অস্তিত্ব হয়তো খুব বেশি দিনের নয়। বিগত কয়েক বছরে এই আশঙ্কাগুলো যেন আরও বেশি বাস্তব রূপ নিয়েছে। যখন পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা হিমবাহ গলে যাওয়া কিংবা ওজোন স্তরের ক্ষয় নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন, তখন একদল গণিতবিদ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিসংখ্যানগত পদ্ধতির মাধ্যমে মানবজাতির বিলুপ্তির এক চাঞ্চল্যকর হিসাব কষেছেন।

এই গাণিতিক হিসাব কোনো জীবাশ্ম রেকর্ড বা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির তথ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি নিছকই পরিসংখ্যান এবং সম্ভাবনার জটিল অঙ্কের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে। এই বিশ্লেষণ থেকে যে অদ্ভুত ও কিছুটা ভয়ংকর উপসংহার বেরিয়ে এসেছে, তা হলো—এই পৃথিবীতে মানবজাতি সর্বোচ্চ আর ১৭ হাজার ১০০ বছর টিকে থাকতে পারে! এই গাণিতিক ভবিষ্যদ্বাণী নাকি মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ, যা এর গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

সংখ্যাটি শুনে হয়তো অনেকের ভ্রু কুঁচকে যেতে পারে। কিন্তু এই জটিল অথচ আকর্ষণীয় গাণিতিক তত্ত্বটি আসলে কী এবং কীভাবে গণিতবিদেরা এত নিশ্চিতভাবে এই সংখ্যায় উপনীত হলেন, তা সহজভাবে বোঝা জরুরি। এই বিশেষ তত্ত্বটির নাম ‘ডুমসডে আর্গুমেন্ট’ বা মহাবিপর্যয় যুক্তি, যা ১৯৮৩ সালে অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট ব্র্যান্ডন কার্টার প্রথম উপস্থাপন করেন। এর মূল ভিত্তি হলো ‘কোপারনিকান প্রিন্সিপল’ বা কোপারনিকাসের নীতি।

ষোড়শ শতাব্দীতে নিকোলাস কোপারনিকাস প্রথম প্রমাণ করেছিলেন যে, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয় এবং মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় আমাদের সৌরজগতের বা পৃথিবীর কোনো বিশেষ অবস্থান নেই। ডুমসডে আর্গুমেন্ট ঠিক একই যুক্তি ব্যবহার করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানবজাতির দীর্ঘ ইতিহাসে আমরা যে সময়ে বাস করছি, তা মোটেও বিশেষ কিছু নয়; বরং এটি সম্পূর্ণ এলোমেলো বা র‍্যান্ডম একটি অবস্থান। সময়ের বিশাল টাইমলাইনে আমরা কেবল একটি বিন্দুমাত্র, যার কোনো নির্দিষ্ট বা পূর্বনির্ধারিত গুরুত্ব নেই।

বিষয়টি আরও সহজভাবে বোঝার জন্য কল্পনা করুন, পৃথিবীর অতীত থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ পর্যন্ত যত মানুষ জন্ম নেবে, তাদের সবাইকে একটি সরলরেখায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়েছে। আপনি বা আমি সেই রেখার ঠিক কোন অবস্থানে আছি? যেহেতু আমরা কেউই বিশেষ কেউ নই, তাই এই রেখার ঠিক মাঝামাঝি, শুরুতে, শেষে বা যেকোনো জায়গায় আমাদের থাকার সম্ভাবনা সমান। এই ধারণাটিই ডুমসডে আর্গুমেন্টের মূল ভিত্তি।

হিসাবটি হয়তো এখনও কিছুটা খটমটে লাগছে। চলুন, একটি পরিচিত উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। ধরুন, আপনার সামনে একই রকম দেখতে দুটি বাক্স রাখা আছে। একটি বাক্সে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত নম্বর লেখা ১০টি পিংপং বল আছে। অন্য বাক্সে ১ থেকে ১ লাখ পর্যন্ত নম্বর লেখা এক লাখ বল রয়েছে। তবে আপনি জানেন না কোন বাক্সে কয়টি বল আছে। এবার আপনাকে চোখ বন্ধ করে যেকোনো একটি বাক্স থেকে একটি বল তুলতে বলা হলো। আপনি বলটি তুলে দেখলেন, তাতে ‘৪’ লেখা।

এখন সাধারণ বুদ্ধি খাটিয়ে বলুন তো, ‘৪’ নম্বর লেখা বলটি কোন বাক্স থেকে আসার সম্ভাবনা বেশি? নিঃসন্দেহে আপনি বলবেন, যে বাক্সে ১০টি বল আছে, সেটি থেকে। কারণ, ছোট বাক্স থেকে ‘৪’ নম্বর ওঠার সম্ভাবনা ১০ ভাগের ১ ভাগ। অন্যদিকে, এক লাখ বলের বাক্স থেকে ‘৪’ ওঠার সম্ভাবনা ১ লাখ ভাগের ১ ভাগ, যা প্রায় অসম্ভব! এই সহজ উদাহরণটিই মানবজাতির ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে ডুমসডে আর্গুমেন্টের মূল যুক্তি ব্যাখ্যা করে।

মানবজাতির ক্ষেত্রেও অঙ্কটা ঠিক একই রকমভাবে কাজ করে। পৃথিবীতে এ যাবৎকালে প্রায় ১১ হাজার ৭০০ কোটি (১১৭ বিলিয়ন) মানুষ জন্ম নিয়েছে। অর্থাৎ, আপনি বা আমি হলাম এই পৃথিবীর ১১ হাজার ৭০০ কোটিতম মানুষ। এখন যদি মানবজাতি ভবিষ্যতে সমগ্র গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মানুষ জন্ম দেয় (যা এক লাখ বলের বাক্সের মতো), তবে আমাদের বর্তমান নম্বরটি (১১৭ বিলিয়ন) এত শুরুতে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম হয়ে যায়। বরং, মানবজাতি যদি আরও কয়েক হাজার বছর পর বিলুপ্ত হয়ে যায় (যা ছোট বাক্সের মতো), তবে আমাদের বর্তমান নম্বরটি ১১৭ বিলিয়নে হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

গণিতবিদেরা তাদের যুক্তিতে বলছেন, ওই সরলরেখার কথা অনুযায়ী, আমরা মোট মানবজাতির প্রথম ৫ শতাংশের মধ্যে পড়ি না—এই সম্ভাবনা ৯৫ ভাগ। এই যুক্তিকে ব্যবহার করে অঙ্ক কষলে দেখা যায়, পৃথিবীতে এ যাবৎকাল পর্যন্ত জন্ম নেওয়া মোট মানুষের (১১৭ বিলিয়ন) ২০ গুণের চেয়ে কম মানুষ ভবিষ্যতে জন্ম নেবে। অর্থাৎ, অতীত থেকে ভবিষ্যৎ পর্যন্ত পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া মানুষের সর্বোচ্চ সংখ্যা হতে পারে ১১৭ বিলিয়নের ২০ গুণ, যা ২.৩৪ ট্রিলিয়ন। এর বেশি মানুষ পৃথিবীতে আসা গাণিতিকভাবে প্রায় অসম্ভব বলে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিসংখ্যানটি মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক নতুন এবং গভীর চিন্তার খোরাক যোগাচ্ছে, যেখানে কেবল প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ নয়, বিশুদ্ধ গণিতও আমাদের অস্তিত্বের সীমা নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ