অস্ট্রেলিয়ার বন্দরগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অটোমেশনের ব্যাপক প্রসারের মুখে সেখানকার ডক শ্রমিকরা এক যুগান্তকারী দাবি উত্থাপন করেছে। তারা বেতন হ্রাসের প্রশ্ন ছাড়াই সপ্তাহে মাত্র ২৮ ঘণ্টা কাজের দাবি জানিয়েছে। শ্রমিকদের এই নতুন দাবি দেশের বন্দর শিল্পে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যেখানে প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং শ্রমিকের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মেরিটাইম ইউনিয়ন অফ অস্ট্রেলিয়া (MUA) জানিয়েছে, বন্দর লজিস্টিকস জায়ান্ট ডিপি ওয়ার্ল্ডের নেতৃত্বাধীন এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শ্রমিকদের চাকরিকে 'লক্ষ্যবস্তু' বানিয়েছে। ইউনিয়ন দৃঢ়ভাবে বলেছে, যদি ডিপি ওয়ার্ল্ড এআই এবং অটোমেশন ব্যবহার করতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই এর 'সামাজিক লভ্যাংশ' প্রদান করতে হবে। শ্রমিক সংগঠনের মতে, এই নতুন প্রযুক্তি কেবল টার্মিনাল অপারেটরদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য শ্রমিকদের চাকরি বা জীবিকা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে না।
এমইউএ-এর নির্দেশে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেট ট্যাক্স অ্যাকাউন্টিবিলিটি অ্যান্ড রিসার্চ দ্বারা পরিচালিত একটি গবেষণা অনুসারে, দুবাই-ভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড ক্রমবর্ধমানভাবে তার কার্যক্রমে কর্মচারী ব্যবস্থাপনা এবং কাজের সময়সূচী নিয়ন্ত্রণের জন্য এআই সরঞ্জাম পরীক্ষা করছে। এই অটোমেশন প্রোগ্রামটি 'যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই' এআইকে কার্যক্রমে যুক্ত করার একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণাটি আরও সতর্ক করেছে যে, এই প্রযুক্তি এক হাজার বা তারও বেশি সংখ্যক চাকরির জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, যা ডক এবং রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের ৬০ শতাংশেরও বেশি। সংস্থাটি এআই-সহায়তাযুক্ত রিমোট-কন্ট্রোল ক্রেন এবং চালকবিহীন যান ব্যবহারেরও প্রস্তাব করেছে। ইউনিয়ন ৩ জুলাই এক বিবৃতিতে বলেছে যে, প্রযুক্তি 'শ্রমিকদের জীবন উন্নত করতে ব্যবহৃত হওয়া উচিত, তাদের ধ্বংস করতে নয়', এবং এই যুক্তিতেই তারা ২৮ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহের দাবি জানিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান ফিনান্সিয়াল রিভিউ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ডক শ্রমিকরা তাদের অবস্থানভেদে সপ্তাহে প্রায় ৩২ থেকে ৩৫ ঘণ্টা কাজ করেন। এই আলোচনার সূত্রপাত হওয়ার পর থেকে শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা তাদের এই নতুন কর্মঘণ্টার দাবির মূল কারণ। ইউনিয়ন চাইছে, প্রযুক্তির সুবিধা যেন কেবল কোম্পানির মুনাফায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও ব্যবহৃত হয়।
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বন্দর অপারেটর। এটি দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থা। অস্ট্রেলিয়ায়, সিডনি, মেলবোর্ন এবং দেশের অন্যান্য অংশে অবস্থিত বন্দরগুলোর মাধ্যমে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিপিং কন্টেইনার পরিবহন করে।
বিশ্বব্যাপী ৮৪টি দেশে কার্যক্রম এবং ১ লক্ষ ২৬ হাজারেরও বেশি কর্মচারী নিয়ে এই সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী কন্টেইনার ট্রাফিকের প্রায় এক দশমাংশ পরিচালনা করে। গত বছর, ডিপি ওয়ার্ল্ডের এশিয়া প্যাসিফিক প্রধান নির্বাহী গ্লেন হিলটন বলেছিলেন যে, ক্রমবর্ধমান জটিল সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার জন্য সংস্থাটি এই অঞ্চলের বন্দরগুলোতে এআই ব্যবহার করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রযুক্তির ব্যবহার 'আর ঐচ্ছিক নয়', বরং এটি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
অস্ট্রেলিয়ার এই ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং শ্রমবাজারের ওপর এর প্রভাব নিয়ে চলমান বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যখন এআই এবং অটোমেশন উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করছে, তখন একই সময়ে এটি শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ এবং কাজের প্রকৃতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। এই পরিস্থিতিতে, অস্ট্রেলিয়ার ডক শ্রমিকদের দাবি ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের জন্য একটি মডেল তৈরি করতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি এবং মানবশ্রম সহাবস্থান করবে একটি ন্যায্য ও টেকসই পদ্ধতিতে।