বৃহস্পতিবার, 9 জুলাই 2026
⚠ ব্রেকিং
AI 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

জ্বালানি গবেষণায় বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জন: বাংলাদেশের আজম খানের এআই-নির্ভর উদ্ভাবনী পথচলা

বাংলাদেশের তরুণ গবেষক আজম খান জ্বালানি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিকস নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য 'বৈশ্বিক স্বীকৃতি পুরস্কার ২০২৬' অর্জন করেছেন। তাঁর উদ্ভাবনী কাজ দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন:
জ্বালানি গবেষণায় বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জন: বাংলাদেশের আজম খানের এআই-নির্ভর উদ্ভাবনী পথচলা

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত একসময় কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং সঞ্চালন লাইনের প্রসারের মাধ্যমেই তার অগ্রগতি পরিমাপ করতো। ২০০৯ সালে যেখানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৫ হাজার মেগাওয়াটেরও কম, সেখানে ২০২৫ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে এবং দেশের ৯৯ শতাংশের বেশি মানুষ বিদ্যুতের সুবিধার আওতায় এসেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন আরও বুদ্ধিমান ও টেকসই প্রযুক্তিগত সমাধান। এমন এক সময়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিকস এবং জ্বালানি অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে এক অনন্য অবদান রেখে বাংলাদেশের তরুণ গবেষক আজম খান বিশ্বজুড়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আজম খান ‘বৈশ্বিক স্বীকৃতি পুরস্কার ২০২৬ (গবেষণা বিভাগ)’–এ ভূষিত হয়েছেন। এই অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পুরস্কারের জন্য প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫ হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে মাত্র ৫.৮ শতাংশ গবেষককে নির্বাচিত করা হয়, যা তাঁর কাজের গুণগত মান এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রমাণ। গবেষণাজগতে তাঁর প্রভাব আরও সুদৃঢ় হয়েছে গুগল স্কলার প্রোফাইলে তাঁর কাজের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে; বর্তমানে তাঁর গবেষণাকর্ম ৩০৭টি সাইটেশন বা উদ্ধৃতি অর্জন করেছে। তাঁর এইচ–ইনডেক্স ১২ এবং আই ১০–ইনডেক্স ১৫, যা একজন গবেষকের প্রকাশনার মান ও প্রভাব নির্দেশ করে। এছাড়াও, তাঁর ১৫টির বেশি পিয়ার-রিভিউড গবেষণা প্রবন্ধ, আইইইই সদস্যপদ এবং এআই সমন্বিত ডেটা প্রসেসিং ও সাপ্লাই চেইন প্রযুক্তি–সংক্রান্ত একটি মূল্যবান পেটেন্ট রয়েছে।

আজম খানের গবেষণার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল আইইইই ওপেন জার্নাল অব দ্য কম্পিউটার সোসাইটিতে প্রকাশিত তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা হলো—বায়ু টারবাইনের সেন্সরের ত্রুটি শনাক্তকরণে পদার্থবিজ্ঞান নির্দেশিত বায়েসিয়ান নিউরাল নেটওয়ার্কের ব্যবহার। এই গবেষণায় তিনি পদার্থবিজ্ঞানভিত্তিক মডেল এবং বায়েসিয়ান নিউরাল নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে একটি অত্যাধুনিক এআই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যা বায়ু টারবাইনের সেন্সরের সূক্ষ্ম ত্রুটিগুলো নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম। বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে এই মডেল ৯৭.৬ শতাংশ নির্ভুলতা এবং ৯১.৮ শতাংশ রিকল অর্জন করেছে, যা শিল্পক্ষেত্রে এর ব্যবহারিক উপযোগিতা প্রমাণ করে।

এই অত্যাধুনিক এক্সপ্লেইনেবল এআই প্রযুক্তি কেবল ত্রুটি শনাক্তই করে না, বরং গিয়ারবক্সের তাপমাত্রা, ব্লেডের কম্পন এবং জেনারেটরের টর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ত্রুটির কারণও ব্যাখ্যা করতে পারে। সহজ কথায়, এটি বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা বিপর্যয় ঘটার আগেই প্রকৌশলীদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠাতে সক্ষম, যা রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর এবং সময়োপযোগী করে তোলে। বাংলাদেশের সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫-এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আজম খানের এই গবেষণা সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে আরও ডেটাভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে।

তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলো, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় জ্বালানি ব্যবহারের ধরন অপ্টিমাইজ বা সর্বোত্তমকরণ: টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি এআই–চালিত পদক্ষেপ। এই গবেষণায় তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শক্তি ব্যবস্থাপনার কৌশল দেখিয়েছেন, যা শক্তির অপচয় কমিয়ে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে। এই মডেল বাংলাদেশের গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম বা সাভারের মতো ভারী শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। শিল্পক্ষেত্রে শক্তি ব্যবস্থাপনার এই উন্নত পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে শক্তির অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে, যা একদিকে উৎপাদন খরচ হ্রাস করবে এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের শিল্পকারখানার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে।

আজম খান কেবল গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তাঁর উদ্ভাবনী কাজের সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন বৈশ্বিক শিল্প খাতেও। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায় হুন্দাই মোটর ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের উৎপাদন কার্যক্রমে অপারেশনস ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত। সেখানে তিনি মেশিন লার্নিং, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং শক্তি দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সরাসরি কাজ করছেন, যা তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে বাস্তব শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে। তাঁর এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে তাঁর গবেষণা কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে আজম খান জানান, তিনি সমন্বিত ডেটা সিস্টেম ও প্রেডিক্টিভ মেইনটেন্যান্স, কার্বন–সচেতন এআই উন্নয়ন এবং ডেটা সেন্টারের মতো শক্তিশালী ও নিবিড় ডিজিটাল অবকাঠামোর জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে আগ্রহী। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, বরং কোন সময় কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে, কোথায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে কিংবা কোথায় অপচয় হচ্ছে, সেই বিষয়গুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নিরূপণ করে একটি স্মার্ট ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তাঁর এই দূরদর্শী ভাবনা এবং নিরলস গবেষণা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ পথচলায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা যায়।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ