বিশ্ব বাবা দিবস উপলক্ষে কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা তার জীবনের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা, প্রয়াত পিতা এ এস এম নিজামউদ্দিনকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করেছেন। রোববার এই বিশেষ দিনে তিনি বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ববিতা জানান, তার জীবনের প্রতিটি সাফল্য, মূল্যবোধ এবং শৃঙ্খলাবোধের ভিত্তি বাবার হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে অভিনয় জগতে তার যাত্রা, সবকিছুর পেছনেই ছিল পিতার অসামান্য অবদান ও অনুপ্রেরণা।
ববিতার শৈশব কেটেছে বাবার আদর্শ, শাসন এবং অপরিসীম স্নেহের আবহে। ছয় ভাইবোনকে এ এস এম নিজামউদ্দিন অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে মানুষ করেছিলেন। অভিনেত্রী স্মরণ করেন, সন্ধ্যার আগেই তাদের সবাইকে ঘরে ফিরতে হতো এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সময় মেনে চলার কঠোর নির্দেশনা ছিল। বাবার এই শিক্ষা পরবর্তী জীবনে তাকে একজন দায়িত্বশীল, গুছিয়ে চলা এবং পরিপাটি মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে, যা তার কর্মজীবনের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে।
জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষাগুলো ববিতা তার বাবার কাছ থেকেই পেয়েছেন। তিনি জানান, বাবা অফিস থেকে ফিরে পরিবারের সবাইকে পর্যাপ্ত সময় দিতেন। বাবার জন্য পান বানিয়ে দেওয়া, পা টিপে দেওয়া কিংবা ছোট ছোট আবদার করার সেই মুহূর্তগুলো আজও তার হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। এই ছোট ছোট স্মৃতিগুলোই তার জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল এবং পারিবারিক মূল্যবোধের গুরুত্ব শিখিয়েছিল, যা তাকে একজন সংবেদনশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।
অভিনয় জগতে ববিতার আগমনের পেছনেও তার বাবার অনুপ্রেরণা ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। এ এস এম নিজামউদ্দিন ছিলেন একজন ভীষণ সিনেমাপ্রেমী মানুষ। তিনি বিভিন্ন চলচ্চিত্র দেখে বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্যদের সেইসব ছবির গল্প শোনাতেন। শুধু গল্পই নয়, সেই গল্পের চরিত্রগুলো অভিনয় করতেও তিনি সন্তানদের উৎসাহ দিতেন। বাবার এই সিনেমাপ্রীতি এবং উৎসাহই ববিতার মনে অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসার জন্ম দেয় এবং তাকে চলচ্চিত্রের পথে ধাবিত করে।
চলচ্চিত্রে পা রাখার পরও ববিতা তার বাবার অকুন্ঠ সমর্থন সবসময় পেয়েছেন। বিশেষ করে কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘অশনিসংকেত’ ছবিতে অভিনয়ের আগে বাবা ও সত্যজিৎ রায়ের মধ্যে যে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান হয়েছিল, সেই স্মৃতিও তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। বাবার এই ধরনের সমর্থন তার অভিনয়জীবনের প্রতিটি ধাপে তাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে এবং বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে, যা তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি এনে দিয়েছে।
বাবার সঙ্গে একটি মধুর স্মৃতি বর্ণনা করে ববিতা বলেন, একবার বাগেরহাটে থাকার সময় তিনি অন্ধকার রাতে হারিকেন হাতে বাবাকে এগিয়ে আনতে গিয়েছিলেন। মেয়ের এমন আন্তরিকতায় বাবা খুশি হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি কী চান। এই সুযোগে ববিতা মামার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার আবদার করেন এবং বাবাও হাসিমুখে সেই ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন। এই ঘটনাটি বাবার প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা এবং বাবার স্নেহশীল প্রকৃতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তবে সুখস্মৃতির পাশাপাশি ববিতার জীবনে বাবার চলে যাওয়ার গভীর বেদনার অধ্যায়ও রয়েছে। বিয়ের মাত্র চার মাস পরই তিনি তার বাবাকে হারান। বাবার চলে যাওয়ার সেই শূন্যতা আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় এবং তার ব্যক্তিগত জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে রয়ে গেছে। এই ক্ষতি ববিতার জীবনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যা তিনি আজও কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
বাবার প্রতি তার অপরিসীম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে আবেগঘন কণ্ঠে ববিতা তার শেষ ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আব্বা আমার জীবনের আদর্শ। আমি চাই, মৃত্যুর পর বনানী কবরস্থানে আব্বার কবরের পাশেই যেন আমাকে দাফন করা হয়।” এই ইচ্ছা তার বাবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং তাদের চিরন্তন বন্ধনেরই প্রতিচ্ছবি।