বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচন আগামী ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে যখন চলচ্চিত্রাঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে, তখনই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক সভাপতি পদপ্রার্থী খোরশেদ আলম খসরু এবং সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী সামসুল আলমের মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রবিবার, ৫ জুলাই, এই ঘোষণা আসে, যা সমিতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং আসন্ন নির্বাচনের গতিপথকে প্রভাবিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রবিবার ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বৈধ ৪০ জন প্রার্থীর একটি তালিকা প্রকাশ করে। এই প্রকাশিত তালিকায় খোরশেদ আলম খসরু এবং সামসুল আলমের নাম অনুপস্থিত থাকায় বিষয়টি সকলের নজরে আসে। একই দিনে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব স্বাক্ষরিত একটি পৃথক বাতিল প্রার্থীর তালিকাও প্রকাশ করা হয়, যেখানে এই দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের ইঙ্গিত বহন করে।
মনোনয়ন বাতিলের মূল কারণ হিসেবে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা, ২০২৫-এর ১৮(৪) ধারাকে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিধিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি ফেডারেশনসহ সব বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদে পরপর দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন, তবে তাকে অন্তত একটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। এই বাধ্যতামূলক বিরতি নেওয়ার পরই তিনি পুনরায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এই ধারাটি মূলত নেতৃত্ব পদে দীর্ঘস্থায়ী একচ্ছত্র আধিপত্য রোধ এবং নতুন নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে।
এই বিধিমালা অনুসারেই খোরশেদ আলম খসরু এবং সামসুল আলমের মনোনয়ন প্রাথমিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, তারা বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাহী কমিটিতে পরপর দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় এক মেয়াদের বিরতি নেননি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির নির্বাচনে বিধিমালা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা দিয়েছে। এটি নিশ্চিত করে যে, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জড়িত সকলকেই প্রচলিত আইন ও নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই। এরপর থেকে আইনি জটিলতা এবং ভোটার তালিকা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের কারণে টানা সাত বছর ধরে নতুন নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রিতা সমিতির কার্যক্রমে স্থবিরতা এনেছিল এবং চলচ্চিত্র শিল্পে একটি স্থিতিশীল নেতৃত্বের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। বর্তমান নির্বাচনটি তাই শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘ সাত বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন যখন অবশেষে একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছিল, তখন শীর্ষ দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল নিঃসন্দেহে এক বড় ধাক্কা। তবে এটি একই সাথে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দৃঢ় অবস্থানকেও তুলে ধরে, যেখানে তারা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির ক্ষেত্রেও বিধিমালা প্রয়োগে পিছপা হচ্ছে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে আসন্ন নির্বাচনে নতুন মুখ এবং নতুন নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়েছে, যা সমিতির দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন গতি আনতে সহায়ক হতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপ চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। যদিও এই সিদ্ধান্ত খোরশেদ আলম খসরু এবং সামসুল আলমের সমর্থকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করতে পারে, তবে বৃহত্তর পরিসরে এটি একটি নজির স্থাপন করবে যে, সকলকেই আইনের অধীনে কাজ করতে হবে। ৮ আগস্টের নির্বাচন এখন নতুন এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে নবীন ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের মিশ্রণে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কমিটি গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।