দেশের সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম থেকে নবম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি বহাল রাখার নির্দেশনা চেয়ে দায়ের করা একটি রিট আবেদন হাইকোর্টের কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামান ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বুধবার (১৪ অক্টোবর, ২০২৬) এই আদেশ প্রদান করেন। এর ফলে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্প্রতি ঘোষিত ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে এবং প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়া আপাতত বহাল থাকছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ গত ১৬ মার্চ একটি স্মারক জারির মাধ্যমে সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য প্রচলিত লটারি পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিল। পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তের আংশিক পরিবর্তন এনে জানানো হয় যে, দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে, তবে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতিই কার্যকর থাকবে। এই পরিবর্তনটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় এবং অভিভাবক ও শিক্ষাবিদ মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
মন্ত্রণালয়ের এই লটারি পদ্ধতি বাতিলসংক্রান্ত গত ১৬ মার্চের স্মারকের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মুভমেন্ট ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড গুড গভর্ন্যান্স ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ গত ৭ অক্টোবর একটি রিট আবেদন দায়ের করেন। রিটটি আদালতের আজকের কার্যতালিকায় ২৯ নম্বর ক্রমিকে উঠেছিল। রিট আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী জাহিদুর রহমান তালুকদার, এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. কামাল পারভেজ, যিনি আদালতের কাছে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
রিট আবেদনকারী আইনজীবী জাহিদুর রহমান তালুকদার গণমাধ্যমকে জানান যে, তাদের মূল আবেদন ছিল প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সকল শ্রেণিতেই লটারি পদ্ধতি বহাল রাখা। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভর্তি প্রক্রিয়ার নীতিমালা প্রণয়নের সময় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং গবেষণার ভিত্তিতে একটি সুচিন্তিত ও দীর্ঘমেয়াদী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত, যাতে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন না হয় এবং শিক্ষার্থীদের উপর চাপ সৃষ্টি না হয়। আদালত অবকাশকালীন বেঞ্চ হওয়ায় রিটটি নিয়মিত আদালতে উপস্থাপনের জন্য কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন। অবকাশ শেষে আগামী ২৫ অক্টোবর নিয়মিত বেঞ্চ বসলে রিটটি পুনরায় শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, এর আগে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সৃষ্ট অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সকল শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছিল। সেই থেকে এই পদ্ধতিই কার্যকর ছিল, যা অনেক অভিভাবকের কাছে সুবিধাজনক মনে হয়েছিল। তবে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ গত ১৬ মার্চ একটি স্মারকে লটারি পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দেয়। এর ধারাবাহিকতায়, আসন্ন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ডিজিটাল লটারি এবং দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে।
দায়ের করা রিট আবেদনে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি ও ওপরের শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি পরীক্ষা চালুর বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত যাবতীয় কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির প্রার্থনা করা হয়েছে। এছাড়াও, ওই ঘোষণা অনুসরণ করে প্রথম শ্রেণি ও অন্যান্য শ্রেণিতে ভর্তিতে পরীক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিবাদীদের বিরত রাখার জন্য নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে, যাতে পূর্বের লটারি পদ্ধতিই কার্যকর থাকে।
রিটে বিদ্যমান লটারিভিত্তিক ভর্তি-ব্যবস্থা বহাল রাখার জন্যও নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এই রিট আবেদনে শিক্ষাসচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিবকে বিবাদী করা হয়েছে। আদালত অবকাশ শেষে নিয়মিত বেঞ্চে বিষয়টি শুনানির জন্য পাঠালেও, এর মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও রয়ে গেল এবং আগামীতে এই বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হয়, সেদিকেই সকলের দৃষ্টি থাকবে।