জাতীয় অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর বা জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন সংবাদ প্রকাশের বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা চেয়ে সংসদীয় কমিটিতে প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। একই সঙ্গে গুজব, ভুয়া খবর বা ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ানোর বিরুদ্ধেও নিজেদের একই ধরনের ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংস্থাটি। এই প্রস্তাবিত ক্ষমতাগুলোর মধ্যে সাংবাদিকদের আর্থিক জরিমানার বিধান যুক্ত করার বিষয়টিও রয়েছে, যা সাংবাদিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেস কাউন্সিলের দেওয়া এক বিশদ প্রতিবেদনে এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে, যা নিয়ে এখনো সংসদীয় কমিটিতে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।
প্রেস কাউন্সিলের এই প্রস্তাবনায় কেবল স্বপ্রণোদিত ব্যবস্থা গ্রহণ বা আর্থিক জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংস্থাটি সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও সনদ প্রদান, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে তাদের আওতার মধ্যে আনার মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে। এছাড়া সাংবাদিকদের জন্য একটি আচরণবিধি তৈরি, স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধা বা হামলার ঘটনায় তদন্ত পরিচালনা এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা প্রদানের মতো ক্ষমতাও চাওয়া হয়েছে। নিজেদের আর্থিক স্বনির্ভরতার জন্য সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যার ভিত্তিতে লেভি বা চাঁদা আদায়ের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও এই প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে, যা কাউন্সিলের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও গণমুখী করার লক্ষ্যে ১৯টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার অংশ।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল থেকে এই প্রস্তাবনার যৌক্তিকতা ও এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার মানোন্নয়ন ও মান সংরক্ষণের পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা করাই ছিল বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের মূল উদ্দেশ্য। তবে সরকারি এই সংস্থাকে অতীতে কখনোই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি; বরং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তারা এমনভাবে নিজেদের আইন সংশোধন করার প্রস্তাব তৈরি করেছিল, যাকে সাংবাদিকেরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বর্তমানের এই নতুন ক্ষমতা চাওয়ার প্রচেষ্টা অতীতের সেই চেষ্টারই পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন অনেকে। প্রেস কাউন্সিলকে স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী হবে বলে তাদের আশঙ্কা।
সংসদীয় কমিটির আলোচ্যসূচিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর সার্বিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও গণমুখী করার ক্ষেত্রে করণীয় নিয়ে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রস্তাবনা আসে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৪টি প্রতিষ্ঠান এ-সংক্রান্ত লিখিত প্রস্তাব দেয়, যার মধ্যে ‘বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সার্বিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও গণমুখীকরণের লক্ষ্যে সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি অন্যতম। প্রেস কাউন্সিলের সচিব (তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব) মো. আবদুস সবুরের সই করা এই প্রতিবেদনটি কমিটিতে জমা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়েছে, বর্তমান অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে সম্প্রসারিত ও আধুনিক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, মানোন্নয়ন, মান সংরক্ষণসহ অপসাংবাদিকতা ও অপপ্রচার প্রতিরোধে ১৯৭৪ সালের প্রেক্ষাপটে প্রণীত দ্য প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট যুগোপযোগী করা অত্যন্ত জরুরি।
স্মরণীয় যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের জুনে এই সংশোধনীর খসড়া মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদনও লাভ করে। তবে শেষ পর্যন্ত আইনটি আর সংশোধন করা হয়নি। তৎকালীন প্রস্তাবনায়ও অর্থদণ্ডের বিধান এবং স্বপ্রণোদিতভাবে অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। প্রথমে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান প্রস্তাব করা হলেও মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদনের সময় অর্থের পরিমাণ বাদ দেওয়া হয়। সে সময় এই উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের আমলের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব (Newspaper Owners’ Association of Bangladesh) জানিয়েছিল, প্রস্তাবিত সংশোধনী অস্পষ্ট এবং এর অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হানিকর বা অবমাননাকর বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি, যা উদ্বেগের কারণ। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে দেওয়া প্রেস কাউন্সিলের বর্তমান প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে নোয়াবের সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী তার পূর্বের অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করে বলেন, প্রেস কাউন্সিল বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হলে আইন-আদালতের প্রয়োজনীয়তা থাকে না। তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, যেভাবে আইনি ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক চর্চা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, প্রেস কাউন্সিলের এই প্রস্তাবনা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংস্থাটি যেখানে নিজেদের আধুনিকায়ন ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধের কথা বলছে, সেখানে সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন যে, এই ক্ষমতাগুলো শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ও নির্ভীক সাংবাদিকতাকে দমনের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং এর ওপর যেকোনো ধরনের বিধিনিষেধ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রস্তাবনা তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা উচিত।