ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় তিগ্রে প্রদেশে ইরিত্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি আঞ্চলিক সংঘাতের এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে, যা হর্ন অফ আফ্রিকা জুড়ে বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। ইথিওপিয়া এবং ইরিত্রিয়া উভয়ই একে অপরের বিরুদ্ধে উস্কানি ও আগ্রাসনের অভিযোগ আনছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক মহল থেকে সংযমের আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি'র এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিদেশি নিরাপত্তা কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে যে, তিগ্রেতে প্রায় ৫,০০০ থেকে ৮,০০০ ইরিত্রীয় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
উভয় দেশের মধ্যে বাগযুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, ইথিওপিয়া সরকার গত ৮ই অক্টোবর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি চিঠি পাঠিয়েছে, যেখানে তাদের ভূখণ্ড থেকে ইরিত্রীয় সেনাদের অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। চিঠিতে ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেডিওন তিমোথিওস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইরিত্রীয় সেনাদের উপস্থিতির কারণে ইথিওপিয়ার কাছে 'আত্মরক্ষা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই'। এর প্রতিক্রিয়ায়, ৭ই অক্টোবর এক্সে (পূর্বে টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ইরিত্রিয়ার তথ্যমন্ত্রী ইয়েমানে মেসকেল ইথিওপিয়াকে 'নিরন্তর যুদ্ধের দামামা বাজানোর' অভিযোগ করেন। দুই দিন পর তিগ্রিন্যা ভাষায় লেখা আরেক পোস্টে তিনি বলেন, 'ইরিত্রিয়ার সার্বভৌম রাষ্ট্র রক্ত ও আইনের দ্বারা আবদ্ধ' এবং হুঁশিয়ারি দেন, 'যারা এটিকে স্পর্শ করবে, তাদের দুর্ভোগ অনিবার্য'।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিগ্রেতে আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত অবনতির দিকে গড়িয়েছে। কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, ইথিওপিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে এই উত্তেজনা বাড়িয়েছে। গত সপ্তাহে ইথিওপিয়া মিশর ও ইরিত্রিয়ার কূটনীতিকদের বহিষ্কার করে, যার ফলে ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার সাথে সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এই পদক্ষেপগুলো আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সোমবার ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ যখন আরও পাঁচ বছরের জন্য শপথ গ্রহণ করেন, তখন তিনি 'সমুদ্রে প্রবেশাধিকার'কে একটি অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। এই বক্তব্য নতুন করে জল্পনা তৈরি করেছে যে, তিনি বলপূর্বক ইরিত্রিয়ার কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ আসাব বন্দর দখল করতে চান, যা ইরিত্রীয় পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
যদিও ইথিওপিয়ান ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সেস (ENDF), তিগ্রে পিস মিলিশিয়ার সহায়তায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং তিগ্রের রাজধানী মেকেলে পুনরুদ্ধার করেছে, তবে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অস্থিতিশীল। একই সময়ে, প্রত্যক্ষদর্শীরা তিগ্রের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তের দিকে ইরিত্রীয় সেনাদের উপস্থিতি সম্পর্কে জানিয়েছেন, যা সংঘাতের দ্বিমুখী প্রকৃতি এবং জটিলতাকে তুলে ধরে। এই ধরনের প্রতিবেদনগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, তিগ্রেতে ইথিওপিয়ার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও, ইরিত্রিয়ার উপস্থিতি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইথিওপিয়া এবং ইরিত্রিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে জটিল করে তুলেছে। দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একটি ভয়াবহ সীমান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যার ফলস্বরূপ হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। যদিও ২০১৮ সালে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তবে সীমান্ত বিরোধ এবং ঐতিহাসিক অবিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে দূর হয়নি। ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার প্রাক্তন শাসক তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে এবং তিগ্রেতে ইথিওপিয়ার সামরিক অভিযানকে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করে। এই ঐতিহাসিক ক্ষত ও পারস্পরিক সন্দেহ বর্তমান সংঘাতকে আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছে এবং যেকোনো সমাধানকে কঠিন করে তুলছে।
ইথিওপিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নতুন ধরনের বিরোধী জোটের উত্থানও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 'সিমদো' আন্দোলন, যার তিগ্রিন্যা অর্থ 'সংযুক্তি', প্রাথমিকভাবে ২০১৫ সালে তিগ্রে ও ইরিত্রিয়ার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে কর্মী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত শান্তি উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়েছিল। মার্কিন-ভিত্তিক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি-এর সিনিয়র ইস্ট আফ্রিকা বিশ্লেষক ড. জালালে গেটাচেউ বিরু ডয়চে ভেলেকে জানান, এই আন্দোলন পরবর্তীতে একাধিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে গেছে এবং বর্তমানে ইথিওপিয়ার মধ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠী, বিশেষ করে জাতিগত ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে এমন গোষ্ঠীগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
সেপ্টেম্বরে ঘোষিত 'ইথিওপিয়ান পিপলস ফোর্সেস অ্যালায়েন্স ফর সারভাইভাল', যা সংক্ষেপে 'অ্যালায়েন্স ফর সারভাইভাল' নামে পরিচিত, এই সিমদো আন্দোলন থেকেই উদ্ভূত। জালালের মতে, এই জোটের লক্ষ্য হলো বর্তমান সরকারকে অপসারণ করা এবং একটি সাংবিধানিক সংলাপ শুরু করা। এই নতুন বিদ্রোহী জোট তিগ্রে সংঘাতের গতিপথকে সম্পূর্ণ নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা কেবল তিগ্রে নয়, সমগ্র ইথিওপিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করতে পারে। আঞ্চলিক সংঘাতের জটিলতা বাড়ার সাথে সাথে, ইথিওপিয়া এবং ইরিত্রিয়ার মিত্ররা এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তা বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে, যা হর্ন অফ আফ্রিকার লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করবে।
এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা কেবল ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর হুমকি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। তবে, ক্রমবর্ধমান যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে, যা হর্ন অফ আফ্রিকা অঞ্চলে একটি অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করছে।