বৃহস্পতিবার, 15 অক্টোবর 2026
⚠ ব্রেকিং
প্রশাসন 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন: ভোগান্তির শিকার প্রবাসী ও সাধারণ যাত্রীরা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার নিম্নমান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রবাসীরা সহ সাধারণ যাত্রীরা ইমিগ্রেশন, লাগেজ সংগ্রহ ও অন্যান্য পরিষেবা নিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।

শেয়ার করুন:
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন: ভোগান্তির শিকার প্রবাসী ও সাধারণ যাত্রীরা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীসেবার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ পাচ্ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিক পরিষেবা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগত ও বহির্গামী যাত্রীদের, বিশেষ করে প্রবাসী এবং হজ পালনকারীদের, চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। একটি স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল প্রত্যয় যেখানে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত, সেখানে এমন মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের এই স্থবিরতা দেশের সামগ্রিক প্রগতির ওপর প্রশ্ন তৈরি করছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ও সংঘাতের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ, প্রশাসন ও নাগরিক সেবায় আমূল পরিবর্তন আনার উদাহরণ থাকলেও, বাংলাদেশ এত বছরের স্বাধীনতা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়নে পিছিয়ে রয়েছে। যদিও দেশজুড়ে রাস্তাঘাট, সেতু, কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শপিং মলের মতো দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, তবে এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মানুষের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, সততা ও নাগরিক আচরণে একই মাত্রায় পরিবর্তন আসেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে মনে করা হচ্ছে, সভ্যতার বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে সমাজে অসহিষ্ণুতা, স্বার্থপরতা এবং অনিয়মপ্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা 'সোনার বাংলা'র স্বপ্নকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে যখন জনগণের সম্পদ ব্যক্তিস্বার্থে লুটপাট হয়।

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের আলোকেই হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীসেবার বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের বিমানবন্দরের সঙ্গে তুলনা না করলেও, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অনেক প্রাদেশিক বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অনেক বাস্তবতা হতাশাজনক বলে প্রতীয়মান হয়। বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় অনেক যাত্রীর মনে বিমানবন্দরে নামার আগেই এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়, যা ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া, লাগেজ সংগ্রহ, পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা, বিভিন্ন ধরনের হয়রানি এবং সেবার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার মতো বিষয়গুলো কেন্দ্র করে।

একজন আন্তর্জাতিক যাত্রী, যিনি হয়তো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দেশে ফিরছেন, তার জন্য এমন অভিজ্ঞতা সত্যিই অনভিপ্রেত। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন, লাগেজ বেল্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, অনেক সময় লাগেজ খুঁজে পেতে ভোগান্তি, এবং বিমানবন্দরের সামগ্রিক অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ যাত্রীদের দেশে ফেরার আনন্দকে ম্লান করে দেয়। এই ধরনের অব্যবস্থাপনা কেবল সাধারণ যাত্রীদের জন্যই নয়, বিদেশি পর্যটকদের জন্যও দেশের একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিশেষ করে, যে প্রবাসীরা বছরের পর বছর বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, দেশে ফিরে তাঁদের ন্যূনতম সম্মান ও স্বস্তি পাওয়ার পরিবর্তে কেন ভোগান্তির শিকার হতে হবে—এই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁদের কষ্টার্জিত মালামাল নিয়ে কেন উদ্বিগ্ন থাকতে হবে, অথবা অভিযোগ থাকলে তার প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা কোথায়, তা স্পষ্ট নয়। একইভাবে, হজ পালন শেষে দেশে ফেরা হাজিরা কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগেজ ও জমজমের পানির জন্য অপেক্ষা করবেন, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও সেবার মান দেখে একজন যাত্রীর মনে আস্থার জন্ম হওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু প্রাথমিক অভিজ্ঞতাই যদি ভোগান্তির হয়, তাহলে আমাদের আন্তর্জাতিক পরিচিতি কীভাবে সুদৃঢ় হবে?

জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয় এবং জনপ্রতিনিধিদের সুযোগ-সুবিধার ব্যয় বহন করা হয়। এই পরিস্থিতিতে, সেই জনগণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ন্যূনতম মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা কেন এত কঠিন হবে, তা একটি গুরুতর প্রশ্ন। জনগণের অর্থ যখন জনসেবার জন্য ব্যবহৃত হয়, তখন সেই সেবার মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। বর্তমান যাত্রীসেবার নিম্নমান এই মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

ভিআইপি প্রটোকল এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও ব্যবস্থা থাকা অস্বাভাবিক নয়, তবে তার অর্থ এই নয় যে সাধারণ যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে, হয়রানির শিকার হতে হবে কিংবা সেবার জন্য অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। ভিআইপি সুবিধা থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণ নাগরিকের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। ভিআইপি এবং সাধারণ যাত্রীর মধ্যে সেবার মান ও প্রাপ্যতার এই বিশাল বৈষম্য দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক সমতার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।

সুতরাং, সমস্যাটি কেবল বিমানবন্দরের অবকাঠামো বা কর্মীর অভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক মানসিকতা এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতিরও একটি প্রতিচ্ছবি। একটি বিমানবন্দর কেবল একটি ভবন, রানওয়ে বা ইমিগ্রেশন কাউন্টার নয়; এটি একটি দেশের পরিচয়, তার প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার প্রতীক। এই সমস্যাগুলোর সমাধান কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং প্রয়োজন একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক-কেন্দ্রিক সেবা প্রদানের মানসিকতাকে জোরদার করবে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ