সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' বইটি বিক্রয় করার কারণে দেশের স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)-এর বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে এক ন্যাক্কারজনক হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই হামলার জেরে ইউপিএল কর্তৃপক্ষ তাদের বিক্রয়কেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় এবং তাদের কর্মীদের হেনস্তা করা হয়। এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি ও ইউপিএল-এর ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন, যেখানে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, ভয় পেয়ে গুটিয়ে গেলে সমাজে এমন ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর ইউপিএল-এর বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে হামলা, প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ওপর নির্যাতন এবং কয়েক ঘণ্টা ফাঁড়িতে আটকে রাখার ঘটনার পর কেবল একদিনের জন্য বিক্রয়কেন্দ্রটি বন্ধ রাখা হয়েছিল। মাহরুখ মহিউদ্দিন জানিয়েছেন, আইনি প্রস্তুতির পাশাপাশি জনবল সংকটের কারণে এই একদিনের বিরতি নিতে হয়েছিল। তবে গত বুধবার সকাল থেকেই বিক্রয়কেন্দ্রটি পুরোদমে চালু হয়েছে এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে। ইউপিএল-এর ফেসবুক পেজে বিক্রয়কেন্দ্র খোলার ঘোষণা দেওয়ার পর পাঠকদের কাছ থেকে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া মিলেছে, যা প্রতিষ্ঠানের মনোবলকে আরও চাঙ্গা করেছে।
এই হামলার ঘটনায় আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে মাহরুখ মহিউদ্দিন জানান, তাদের লিখিত অভিযোগটি থানা গ্রহণ করেছে, তবে সেটিকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নয়, বরং একটি অভিযোগ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করছে এবং আইনি প্রতিকার চাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চও সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছিল এবং ইউপিএল তা সরবরাহ করেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিজেই বাদীপক্ষ থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারণ শুধু আক্রান্ত ব্যক্তি নয়, এখানে রাষ্ট্র ও আইনকেও আক্রমণ করা হয়। ফলে শুধু আক্রান্ত ইউপিএল নয়, অপরাধীদের খুঁজে বের করা, তাদের ইন্ধনদাতাদের তদন্ত করা এবং বিচারের আওতায় আনা রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব।
ঘটনাটি কি কেবল কয়েকজন দুষ্কৃতকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি এর পেছনে পুলিশ বা সরকারের কোনো চাপ ছিল — এমন প্রশ্নের জবাবে মাহরুখ মহিউদ্দিন স্পষ্ট করেন যে, ঘটনার শুরু থেকেই তারা সরকারের কাছ থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক সহযোগিতা পেয়েছেন। তাদের দিক থেকে কোনো সরাসরি বা পরোক্ষ চাপ এ পর্যন্ত অনুভব করেননি। থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন এবং প্রতিদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে তিনি নিশ্চিত যে, ঘটনাটি সুপরিকল্পিত ছিল। তার মতে, মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত বা পরিপূর্ণভাবে অন্ধ না হয়ে থাকলে হামলার ইন্ধনদাতারা ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছেন যে, ইউপিএল-এর দৃঢ় অবস্থানের কারণে আপামর পাঠকসমাজ, গণমাধ্যম এবং সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কতটা সমর্থন তারা পেয়েছেন।
ইউপিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও উল্লেখ করেন যে, এই পরিস্থিতিতে তারা নতুন কিছু করেননি। ইউপিএল-এর পেশাদারি এবং চাপের মুখে নতি স্বীকার না করার যে নীতি বরাবরই ছিল, তারা কেবল সেটাই ধরে রেখেছেন। তিনি বিশেষভাবে গণমাধ্যমকে ধন্যবাদ জানান, কারণ ইউপিএল যে তার প্রকাশিত প্রতিটি বইকে ধারণ করে এবং আইনসম্মতভাবে সরকার নিষিদ্ধ করেনি — এমন কোনো বইকে যে তারা সরিয়ে নেবে না, তাদের এই নীতিকে গণমাধ্যম যথাযথভাবে প্রচার করেছে। এটি প্রকাশনা শিল্পের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় ইউপিএল-এর অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
অতীতে এমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে মাহরুখ মহিউদ্দিন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরপর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজিত বইমেলার একটি ঘটনার কথা স্মরণ করেন। সেখানে কয়েকজন অত্যুৎসাহী তরুণ এস এ করিমের 'শেখ মুজিব: ট্রায়াম্ফ অ্যান্ড ট্র্যাজেডি' এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের 'বাংলাদেশ: শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল' — এই দুটি বই নিয়ে আপত্তি তোলে। তিনি জানান, এস এ করিমের বইটি মোটেই শেখ মুজিবুর রহমানের স্তুতিমূলক জীবনালেখ্য নয়, উপরন্তু আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে কারও কারও বইটি নিয়ে আপত্তি ছিল। মওদুদ আহমদ সম্পর্কে সেই তরুণেরা অবগত ছিল না এবং তার কাজ বা মতাদর্শ সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা ছিল না। এটি যে শেখ মুজিবুর রহমানের সময় নিয়ে একটি সমালোচনামূলক ও বহুল প্রশংসিত গ্রন্থ, সেই ধারণাও তাদের ছিল না। অথচ তারা দাবি করছিল, শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কোনো বই প্রদর্শন করা যাবে না। তবে সেই উত্তেজনাকর সময়েও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ইতিবাচক প্রচেষ্টা লক্ষ করা গিয়েছিল।
মাহরুখ মহিউদ্দিনের এই বক্তব্য সমাজে 'মব' তৈরির উপাদানকে লালন করার বিরুদ্ধে একটি সতর্কবাণী। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, যদি ভয় পেয়ে গুটিয়ে যাওয়া হয়, তবে এমন ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে এবং তা কেবল প্রকাশনা শিল্প নয়, বরং সামগ্রিকভাবে সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা ও সুস্থ পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। ইউপিএল এই ঘটনার মাধ্যমে তাদের অদম্য সাহস ও নীতিগত অবস্থানের পরিচয় দিয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।