মাগুরায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এক আবাসিক গ্রাহকের নামে ইস্যু করা হয়েছিল অবিশ্বাস্য অঙ্কের একটি বিদ্যুৎ বিল, যা দেখে হতবাক হয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট পরিবার ও এলাকার মানুষ। মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে ওই গ্রাহককে পরিশোধ করতে বলা হয়েছিল ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিলের 'ডিমান্ড চার্জ' অংশে ভুলবশত মিটারের সিল নম্বর বসিয়ে দেওয়ায় এই গুরুতর ত্রুটি ঘটেছে। বিলটি সংশোধনের পর গ্রাহক তাঁর প্রকৃত পাওনা ১ হাজার ৯৬৩ টাকা পরিশোধ করেছেন।
ঘটনাটি সদর উপজেলার মঘি ইউনিয়নের কেচুয়াডুবি গ্রামের মোছা. আলেয়া খাতুনের সঙ্গে ঘটেছে। তিনি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহীদুল ইসলামের স্ত্রী। মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আড়পাড়া আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে চলতি মাসে তাঁর নামে এই অস্বাভাবিক বিল ইস্যু করা হয়। বিল হাতে পাওয়ার পর গ্রাহক পরিবার চরম বিস্ময় ও দুশ্চিন্তায় পড়ে। এমন বিপুল অঙ্কের বিল দেখে প্রথমে তারা কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না, কারণ তাদের মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার সাধারণত খুবই সীমিত।
বিলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিটারের রিডিং ছিল ৩৯৫ ইউনিট, যেখানে আগের মাসের অর্থাৎ ৮ আগস্টের রিডিং ছিল ১৬০ ইউনিট। এর অর্থ হলো, এক মাসে মোট ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে। এই ২৩৫ ইউনিটের জন্য প্রথম বিলে ডিমান্ড চার্জ দেখানো হয়েছিল ৪৮২ কোটি ৬৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ টাকা। এর সঙ্গে যোগ করা হয় ২৪ কোটি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৭১ টাকার ভ্যাট এবং ১০ টাকা মিটার ভাড়া। সব মিলিয়ে মোট বিল দাঁড়ায় ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা। এমনকি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ না করলে বিলম্ব মাশুলসহ মোট ৫৩০ কোটি ৯৬ লাখ ৫৯ হাজার ৭৬৪ টাকা পরিশোধের কথা উল্লেখ ছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
১০ সেপ্টেম্বর বিলটি ইস্যু করা হলেও, পরিশোধের শেষ তারিখ ছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। বিলের অস্বাভাবিকতা নজরে আসার পর দ্রুত বিষয়টি বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের জানানো হয়। গ্রাহকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তাৎক্ষণিকভাবে বিলটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। সংশোধিত বিলে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট এবং বিলম্ব মাশুলের ভুলগুলো ঠিক করা হয়, যার ফলে বিদ্যুতের প্রকৃত বিল দাঁড়ায় মাত্র ১ হাজার ৯৬৩ টাকা। যদি কোনো কারণে বিল পরিশোধে বিলম্ব হতো, তবে বিলম্ব মাশুলসহ মোট ২ হাজার ৫৬ টাকা পরিশোধ করতে হতো।
ভুক্তভোগী গ্রাহক আলেয়া খাতুন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিলটি হাতে পাওয়ার পর এমন আকাশছোঁয়া অঙ্ক দেখে তাঁরা প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়েন। তবে দ্রুত বিদ্যুৎ কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তারা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখে এবং বিলটি সংশোধন করে দেয়। তিনি মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সংশোধিত ১ হাজার ৯৬৩ টাকার বিল পরিশোধ করেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন। এই দ্রুত পদক্ষেপের কারণে গ্রাহক পরিবার একটি বিশাল ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেয়েছে।
মাগুরা পল্লী বিদ্যুতের আড়পাড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. রেজাউল করিম এই ভুলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে জানান, গ্রাহকের মিটার পরিবর্তনের সময় অসাবধানতাবশত মিটারের সিল নম্বরের ডিজিটগুলো ডিমান্ড চার্জের ঘরে বসানো হয়েছিল। এই কারিগরি ত্রুটির কারণেই এমন অস্বাভাবিক বিল তৈরি হয়। গ্রাহক তাঁদের এই ভুলের কথা জানালে তাঁরা সঙ্গে সঙ্গেই বিলটি সংশোধন করে দেন এবং গ্রাহকও তাঁর প্রকৃত বিল পরিশোধ করেছেন।
এমন ঘটনা বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর বিলিং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও এক্ষেত্রে দ্রুত ভুল সংশোধন করা হয়েছে, তবে এমন বড় অঙ্কের ত্রুটি সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে এই ধরনের ভুল এড়াতে বিলিং সিস্টেমে আরও বেশি সতর্কতা এবং স্বয়ংক্রিয় ত্রুটি শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন অনেকে। বিদ্যুৎ বিলের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এমন ত্রুটি গ্রাহক সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা কমাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।