লক্ষ্মীপুরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া প্রায় নয় মিনিটের একটি ভিডিওতে তাকে প্রকাশ্যে একজন ব্যক্তির কাছে ২ কোটি টাকা ঘুষ চাইতে দেখা গেছে। এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও পিডিবি কর্তৃপক্ষের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে।
গত রবিবার রাতে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিন সামনে বসে থাকা এক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, “৫ কোটি টাকা থেকে আমাকে ২ কোটি টাকা দেন, আমি সব সই করে দেব।” কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আরও বলেন, “এসি স্যার রাজি হয়ে গেছে, কোনো একটা কারণে, আমি দুই কোটি টাকা থেকে নড়ব না। ৬ কোটি টাকা তিন গুণ না, আমি দুই কোটি টাকার নিচে নড়ব না। চেয়ারম্যানের কাছে যেতে হলে যাব। দেখি চেয়ারম্যান কী কয়।” তার এই বক্তব্য সরকারি দপ্তরে দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
ভিডিওতে নুরুল আমিনকে আরও বলতে শোনা যায়, “একটা বিলের জন্য যদি ২ কোটি টাকা নিই, তাহলে চেয়ারম্যান কি আমার বিরুদ্ধে যাবে? আমাকে জায়গামতো পোস্টিং দেবে।” এই উক্তিটি ইঙ্গিত দেয় যে, পদোন্নতি ও অনুকূল পোস্টিংয়ের বিনিময়েও এমন অনিয়ম সংঘটিত হতে পারে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ভিডিওতে তিনি একটি কাজের ব্যয় এবং প্রকল্পের মালামাল আত্মসাতের বিষয়েও কথা বলেন, যা তার বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
কথোপকথনের একপর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিনকে বলতে শোনা যায়, “সোজা হিসাব, ৩ লাখ টাকার ওয়ার্কে মালামাল লাগে ৩০ লাখ টাকা। তাহলে কত কোটি টাকার মাল সে আত্মসাৎ করছে। ওই হিসাব করে দেখা যাবে, ৫ কোটি টাকার মাল সে আত্মসাৎ করেছে।... ৫ কোটি টাকা থেকে আমাকে ২ কোটি টাকা দেন, আমি সব সই করে দেব।” তার এই মন্তব্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
যদিও ভিডিওটির বক্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং সামনে থাকা ব্যক্তির পরিচয় সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে ভিডিওতে একটি টাকার বান্ডিল নিয়ে কথোপকথন চলতে দেখা যায়। নুরুল আমিন সামনে থাকা ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেন, “এখানে কত?” জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, “৩৫ স্যার।” তখন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “হ্যাঁ, ৩৫, ১ লাখ ৩৫।” এরপর সামনের ব্যক্তি বলেন, “আগে দিছিলাম এক লাখ, স্যার।” এই অংশটি ঘুষ লেনদেনের একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত বহন করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লক্ষ্মীপুর পিডিবির একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন যে, নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিন বিভিন্ন কাজের বিল অনুমোদন ও অর্থছাড় করাতে নিয়মিত ঘুষ দাবি করেন। তাদের দাবি, ঘুষ না দিলে বিল আটকে রাখা, কাজের অনুমোদন না দেওয়া কিংবা নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতায় ফেলার কারণে ঠিকাদাররা তার সঙ্গে বিরোধে যেতে সাহস পান না। এই পরিস্থিতিতে ঠিকাদারদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করে, যার ফলে তারা অনিয়মের প্রতিবাদ করতে পারেন না।
একজন ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিল পাওয়ার জন্য প্রকৌশলীর কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। বিভিন্ন অজুহাতে বিল আটকে রাখা হয়। পরে ঘুষের বিষয়ে কথা ওঠে। তার সঙ্গে বিরোধে গেলে কাজ পাওয়া ও বিল ছাড় করানো—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।” এমন অভিযোগ সরকারি দপ্তরের সেবাপ্রদানে স্বচ্ছতার অভাব এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের চিত্রকে স্পষ্ট করে তোলে।
এই অভিযোগ ও ভিডিওর বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও কোনো জবাব দেননি। এরপর আজ সোমবার দুপুর ১২টার দিকে তার কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। এ সময় কার্যালয়ে উপস্থিত পিডিবির সহকারী প্রকৌশলী জানান, নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিন সকাল থেকেই কার্যালয়ে আসেননি, যা তার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পিডিবির কুমিল্লা বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী শেখ ফিরোজ কবির মুঠোফোনে জানান, “ভিডিওটি আমার নজরে এসেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, পিডিবি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে এবং একটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে সরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা যায়।