চট্টগ্রাম বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই এর ভয়াবহতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বছরের প্রথম আট মাসে যেখানে মাত্র ছয়জনের প্রাণহানি ঘটেছিল, সেখানে সেপ্টেম্বরের প্রথম চব্বিশ দিনেই আরও ষোলোজনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ, এই বছর ডেঙ্গুতে মোট ২২ জনের মৃত্যুর মধ্যে ৭৩ শতাংশই ঘটেছে কেবল সেপ্টেম্বরে, যা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে একজন মারা যান। এরপর জুনে দুজন, জুলাইয়ে দুজন এবং আগস্টে একজন রোগীর মৃত্যু হয়। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই এই প্রবণতায় নাটকীয় পরিবর্তন আসে। মাত্র ২৪ দিনের মধ্যে মৃতের সংখ্যা ১৬ জনে উন্নীত হওয়া ডেঙ্গুর আগ্রাসী বিস্তারকেই নির্দেশ করে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
মৃত্যুর পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগস্ট মাসে যেখানে ২ হাজার ৮৭৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন, সেখানে সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই এই সংখ্যা ৫ হাজার ৫৮০ জনে পৌঁছেছে। এক মাসের ব্যবধানে রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৭০৫ জন বৃদ্ধি পাওয়া স্পষ্টতই পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা প্রমাণ করে। সব মিলিয়ে, চলতি বছরে চট্টগ্রাম বিভাগে এ পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ১৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি জনসাধারণকে সতর্ক করে বলেছেন যে, বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থলের আশেপাশে কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একইসাথে, জ্বর বা ডেঙ্গুর অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম জেলার পরিসংখ্যানেও সেপ্টেম্বরের ভয়াবহতা স্পষ্ট। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৯৮৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে ২ হাজার ৩৬ জনই আক্রান্ত হয়েছেন এই সেপ্টেম্বর মাসে। অর্থাৎ, বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় অর্ধেকই গত পঁচিশ দিনের মধ্যে ঘটেছে। একই সময়ে, পুরো বছরে মারা যাওয়া ১৮ জনের মধ্যে ১৩ জনই সেপ্টেম্বরে প্রাণ হারিয়েছেন, যা এই মাসের উচ্চ সংক্রমণের ঝুঁকি এবং তীব্রতা নির্দেশ করে। চিকিৎসক ও কীটতত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন, নগরী, সীতাকুণ্ড এবং কর্ণফুলী উপজেলার রোগীরাই মূলত ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। চলতি মাসে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হওয়ায় এডিস মশার প্রজনন ও ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি প্রায় পঁচিশ দিন পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে, যা প্রাদুর্ভাব বাড়ার অন্যতম কারণ।
জেলা ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে চট্টগ্রাম নগরে একটি জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। পরবর্তীতে সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সেখানেও জরিপ চালানো হয়। এই দুটি জরিপে প্রাপ্ত লার্ভার মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ডেঙ্গুর প্রধান বাহক 'এডিস ইজিপ্টাই' এবং বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ 'এডিস অ্যালবোপিকটাস' হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, যা মশার প্রজাতিগত বিস্তার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে।
কীটতত্ত্ববিদেরা আরও ব্যাখ্যা করেছেন যে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রধান বাহক হলো এডিস ইজিপ্টাই। অন্যদিকে, এডিস অ্যালবোপিকটাস ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ারও বাহক হিসেবে কাজ করে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় এডিস ইজিপ্টাইয়ের লার্ভা বেশি পাওয়া গেলে সেখানে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। একইভাবে, এডিস অ্যালবোপিকটাসের লার্ভা বেশি পাওয়া গেলে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়া সংক্রমণেরও ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, যা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রজাতিভিত্তিক কৌশল নির্ধারণে সহায়ক।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরে আক্রান্তদের মধ্যে ১ হাজার ৮০৯ জন নগরের বাসিন্দা, ১ হাজার ৭২৯ জন জেলার পনেরোটি উপজেলার এবং ৪৪৭ জন অন্য জেলার বাসিন্দা। চলতি মাসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে; ৯২৩ জন নগরের, ৮৫৭ জন উপজেলার এবং ১৬৯ জন অন্য জেলার বাসিন্দা। গত শুক্রবার সকাল দশটা পর্যন্ত পূর্ববর্তী চব্বিশ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ৬৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে ৩৪ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে, যেখানে শয্যার অভাবে অনেককে মেঝেতে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বর, মাথাব্যথা ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গ নিয়ে তাঁরা হাসপাতালে আসছেন।
উপজেলাগুলোর মধ্যে নগরসংলগ্ন সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বিশেষভাবে বেশি। চলতি বছর সীতাকুণ্ড উপজেলায় মোট ৫১৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এসব আক্রান্ত রোগীর অধিকাংশই উপজেলার কুমিরা, ভাটিয়ারী, সোনাইছড়ি ইউনিয়ন এবং পৌর এলাকার বাসিন্দা, যা স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিধন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।