শনিবার, 26 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

কুমিল্লায় কৃতী সংবর্ধনায় চার বছর পর দুই বন্ধুর নাটকীয় পুনর্মিলন: একই কলেজে নতুন পথচলা

কুমিল্লা জিলা স্কুল মাঠে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ঘটে এক বিরল ঘটনা। চার বছর পর অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা হলো দুই বাল্যবন্ধু মো. আবদুল্লাহ আল তামিম ও ফাহিম শারিয়ার সিজানের। নাটকীয় এই পুনর্মিলনের পর জানা গেল, তারা দুজনেই একই কলেজে ভর্তি হয়েছে, যা তাদের বন্ধুত্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

শেয়ার করুন:
কুমিল্লায় কৃতী সংবর্ধনায় চার বছর পর দুই বন্ধুর নাটকীয় পুনর্মিলন: একই কলেজে নতুন পথচলা

কুমিল্লা জিলা স্কুল মাঠে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা হলো দুই বাল্যবন্ধু মো. আবদুল্লাহ আল তামিম ও ফাহিম শারিয়ার সিজানের। চার বছর পর হঠাৎ করেই একে অপরের মুখোমুখি হওয়ায় তাদের চোখে-মুখে ছিল বিস্ময় ও উচ্ছ্বাস। শিখো–প্রথম আলোর আয়োজনে এই কৃতী সংবর্ধনা যেন দুই বন্ধুর জন্য হয়ে উঠেছিল এক আবেগঘন পুনর্মিলনের মঞ্চ, যা সিনেমার গল্পকেও হার মানিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তাদের একজন।

তামিম ও ফাহিমের বন্ধুত্বের শুরু হয়েছিল কুমিল্লার দেবীদ্বার সরকারি রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত তারা পাশাপাশি বসেই ক্লাস করতো। কিন্তু ফাহিমের বাবা, যিনি একজন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই), মো. রফিকুল ইসলামের বদলির কারণে ফাহিমকে দেবীদ্বার ছেড়ে কুমিল্লা শহরে চলে যেতে হয়। এরপর থেকে দীর্ঘ চার বছর তাদের আর দেখা হয়নি, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল তাদের নিবিড় বন্ধুত্ব।

আজ শনিবার দুপুরে কুমিল্লা জিলা স্কুল মাঠে যখন তারা একে অপরের সামনে এসে দাঁড়ালো, প্রথমে যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। দীর্ঘ বিরতির পর প্রিয় বন্ধুকে সামনে দেখে তাদের চোখে মুখে ফুটে ওঠে গভীর বিস্ময়। এরপর আলিঙ্গন, হাসি আর পুরোনো দিনের গল্পে মেতে ওঠে দুই বন্ধু। তাদের এই পুনর্মিলন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও নজর কাড়ে, যা অনুষ্ঠানে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

এই পুনর্মিলনের পর জানা যায় আরও চমকপ্রদ এক খবর। চার বছর আগে যে বন্ধুত্ব বিচ্ছেদে থেমে গিয়েছিল, এবার তা যেন নতুন করে পথচলা শুরু করেছে। কারণ, তামিম ও ফাহিম দুজনেই এখন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল কলেজের শিক্ষার্থী। একই কলেজে ভর্তি হলেও এতদিন তাদের আর দেখা হয়নি। এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানই তাদের একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, যা তাদের বন্ধুত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছে।

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় ফাহিম কুমিল্লা পুলিশ লাইনস স্কুল থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে, আর তামিম দেবীদ্বার সরকারি রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে একই কৃতিত্ব লাভ করেছে। পুরোনো বন্ধুকে ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বসিত ফাহিম জানায়, 'সিনেমায় অনেক সময় এমন দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু বাস্তব জীবনেও যে এমন কিছু ঘটবে, তা কল্পনাও করিনি। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, তামিম আর আমি এখন একই কলেজে ভর্তি হয়েছি। এবার নিশ্চয়ই আমাদের বন্ধুত্ব ও পথচলা দীর্ঘ হবে।' অন্যদিকে, তামিমও তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলে, 'ফাহিম আর আমি প্রায় দুই বছর একসঙ্গে পড়েছি। ও আমার খুব ভালো বন্ধু। ও যখন দেবীদ্বার থেকে চলে যায়, তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল।'

প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় এই জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে দেশের ৬৪ জেলায় এই সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। বিকাশ পাওয়ার্ড বাই হিসেবে এবং কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড ও এটিএন বাংলা সহযোগিতায় এই মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে।

আজ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে কুমিল্লা জিলা স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এই সংবর্ধনার কুমিল্লা পর্ব। জেলার প্রায় ২ হাজার ৬০০ কৃতী শিক্ষার্থী এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন করে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অনেক অভিভাবকও তাদের সন্তানদের এই বিশেষ মুহূর্তে সঙ্গী হতে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সকাল আটটা থেকেই অনুষ্ঠানস্থলে শিক্ষার্থীদের আগমন শুরু হয়। কেউ এসেছে মা-বাবার হাত ধরে, কেউ বা বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে। নিবন্ধন বুথ থেকে ক্রেস্ট, খাবারসহ নানা উপহারসামগ্রী সংগ্রহ করে তারা। এরপর প্রথম আলোর বিভিন্ন আয়োজন ও স্টল ঘুরে দেখে কৃতীরা। ছবি তোলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় সকাল থেকেই পুরো প্রাঙ্গণ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।

সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর কুমিল্লা প্রতিনিধি আবদুর রহমান। তিনি কৃতী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের প্রেরিত বক্তব্য পড়ে শোনান, যা শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা যোগায়। এরপর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, জিপিএ-৫ জীবনের সবকিছু নয়। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মানবিকতাও ধরে রাখতে হবে। কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হাসনাত আনোয়ার উদ্দীন আহমেদ বলেন, শুধু পরীক্ষায় নয়, আচরণ, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতায় জিপিএ-৫ পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তিনি মা-বাবার সঙ্গে খোলামেলা সম্পর্ক রাখারও পরামর্শ দেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. শাহাদাৎ হোসেন মনে করেন, সফল হতে হলে পরিশ্রমের পাশাপাশি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জানতে হবে। এই বিশিষ্টজনেরা শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন এবং তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা জোগান।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ