নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী রূপান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে স্বাস্থ্যসেবার সূচনা হবে পরিবার ও কমিউনিটি পর্যায় থেকে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হবে এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম’ এই নীতিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ তার স্বাস্থ্যখাতকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে, যেখানে নারী ও শিশুদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে উল্লেখ করেন।
বুধবার স্থানীয় সময় দুপুরে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৭-এ অনুষ্ঠিত ‘প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ: প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু রোধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন। সুইডেন ও ইউএনএফপিএর অংশীদারত্বে বাংলাদেশ এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে যখন তা সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জনশক্তি এবং মানুষের উন্নত জীবনে সরাসরি প্রতিফলিত হয়। এ কারণেই এই অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ‘প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ’ বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার অতিরিক্ত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। এই বিশাল সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী প্রতিটি পরিবারকে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করবেন, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করবেন এবং সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশাধিকার আরও সহজ এবং সার্বজনীন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এই ধারাবাহিক স্বাস্থ্যসেবায় পেশাদার মিডওয়াইফদের ভূমিকাকে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, একজন দক্ষ মিডওয়াইফ শুধুমাত্র প্রসবসেবা প্রদানকারী নন; গর্ভধারণের পূর্বপর্যায় থেকে শুরু করে প্রসব-পরবর্তী সময় পর্যন্ত তিনি একজন নারীর আস্থাভাজন স্বাস্থ্যসেবাকর্মী হিসেবে অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা রাখতে পারেন। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই সারা দেশে ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান। এই মিডওয়াইফরা বহুমুখী দক্ষতাসম্পন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করবেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে মিডওয়াইফদের বহুমুখী দায়িত্ব ও গুরুত্ব বিশদভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মিডওয়াইফরা প্রয়োজনীয় প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রসব নিশ্চিতকরণ, জটিলতা দ্রুত শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উচ্চতর স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে রেফার করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। এছাড়াও, মা ও নবজাতকের সেবা, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো, টিকাদান এবং শিশুর সুস্থ বিকাশেও তাঁরা সহায়তা করবেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ পেশাদার মিডওয়াইফারি শিক্ষা চালু, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে মিডওয়াইফ নিয়োগের মাধ্যমে এই খাতে একটি সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ১১ হাজারেরও বেশি লাইসেন্সপ্রাপ্ত মিডওয়াইফ রয়েছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২৫ হাজারেরও বেশি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সুইডেন ও ইউএনএফপিএর সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় বাংলাদেশ ২২টি জেলায় মিডওয়াইফ-নেতৃত্বাধীন সেবা সম্প্রসারণ করেছে, যেখানে দক্ষ মিডওয়াইফরা ১ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি প্রসবে সহায়তা করেছেন এবং মাতৃস্বাস্থ্যের বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়া অসংখ্য মায়েদের গল্প এবং আশার আলো নিয়ে জীবনের পথে যাত্রা শুরু করা নবজাতকদের ভবিষ্যৎ। এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই উদ্যোগগুলো মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুর হার কমানোর পাশাপাশি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ একটি সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এর আওতায় প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি হেলথ কার্ড থাকবে, যা ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড ও ইলেকট্রনিক রেফারেল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ফলে একজন গ্রামীণ নারীর স্বাস্থ্যসেবার তথ্য তার বাড়ির কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিবন্ধিত ও সংরক্ষিত থাকবে। তাকে উচ্চতর পর্যায়ের হাসপাতালে রেফার করা হলে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যতথ্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার সঙ্গে স্থানান্তরিত হবে, যা সেবার মান ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে। প্রধানমন্ত্রী নারীর স্বাস্থ্যসেবাকে শুধুমাত্র গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানিয়ে নারীর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যার মধ্যে কৈশোরকালীন স্বাস্থ্যও অন্তর্ভুক্ত।