বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে, বিশেষ করে শিশুসাহিত্যে, আখতার হুসেন একটি উজ্জ্বল নাম। তাঁর শুভ্রতা ও সরলতা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। সম্প্রতি হাসপাতাল থেকে ফিরবার পথে আনিসুল হক, প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও স্বনামধন্য সাহিত্যিক, তাঁর প্রিয় মানুষ আখতার হুসেনকে স্মরণ করেছেন গভীর শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়। তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে আখতার হুসেনের প্রতি ব্যক্তিগত টান এবং তাঁর বিশাল অবদান। আখতার হুসেন কেবল একজন লেখক নন, তিনি বহু শিক্ষার্থীর ঠোঁটে ঠোঁটে এবং মনে মনে জায়গা করে নেওয়া ছড়ার রচয়িতা, যা পাঠ্যবইয়েও স্থান পেয়েছে।
১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে আখতার হুসেন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর পিতার রেলওয়ের চাকরির সুবাদে কেটেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে—খুলনা, গফরগাঁও, কুলাউড়া। মা আয়শা খাতুনের স্নেহে বেড়ে ওঠা সেই ঘুরে বেড়ানো শৈশবই পরবর্তীকালে তাঁর শিশুসাহিত্যের মূল অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। গফরগাঁওয়ে তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা ঘটে এবং কুলাউড়ায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম মুদ্রিত রচনা। এই বহুমুখী প্রতিভা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন এবং প্রথম দিকের বহু নাটক রচনা ও নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেছেন।
আখতার হুসেন কেবল একজন সাহিত্যিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের প্রথম সারির সংগঠক হিসেবে তিনি শিশুদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গভীর ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর লেখা 'আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক' গানটি ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের সংগঠকদের মুখে মুখে ফিরত। তাঁর এই কর্মময় জীবন প্রমাণ করে যে তিনি কেবল কলম দিয়েই নয়, সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমেও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিলেন এবং নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।
আনিসুল হক নিজের লেখক জীবনের অনুপ্রেরণা হিসেবে আখতার হুসেনকে উল্লেখ করেছেন। ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়ার সময় আখতার হুসেনের 'সমুদ্র অনেক বড়' বইটি তাঁর হাতে আসে, যা তাঁর জীবনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। রফিকুন নবীর অলংকরণে প্রকাশিত এই বইয়ের একটি গল্প ছিল কোকিলকে নিয়ে, যে গ্রাম থেকে ঢাকা এসে চাকরি নেয়। সপ্তাহে ছয় দিন, সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামার এই যান্ত্রিক চাকরি কোকিলটি উপভোগ করলেও, একসময় সে তার শিল্পীসত্তাকে ফিরে পেতে চেয়েছিল। রমনা পার্কে গান গাইতে গিয়ে তার গলা দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসার মর্মস্পর্শী দৃশ্যটি আনিসুল হকের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে।
'সমুদ্র অনেক বড়' বইটির আরেকটি গল্প ছিল একটি কুয়োর ব্যাঙকে নিয়ে। ব্যাঙটি তার ক্ষুদ্র জগৎকে সব মনে করত, কিন্তু ধীরে ধীরে তাকে পুকুর, বিল এবং পরিশেষে সমুদ্রের বিশালতার সাথে পরিচয় করানো হয়। এই গল্পটি আমাদের শেখায় যে, আমরা যে যেখানে আবদ্ধ থাকি, সেটিকে জগৎ মনে করলেও, আসল জগৎ অনেক বড় ও বিস্তৃত। আখতার হুসেনের এই গল্পগুলো আনিসুল হককে কেবল মুগ্ধই করেনি, বরং রংপুর জিলা স্কুলের সেই ছাত্রটিকে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, গল্পকার হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল।
বহু বছর পর, যখন আনিসুল হক ঢাকা শহরে আসেন এবং প্রথমে কবিতা লেখার চেষ্টা করেন, তখনও আখতার হুসেনের প্রভাব তাঁর ওপর কাজ করে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময়, ১৯৮৯ সালে, তাঁর 'খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে' বইটি বের হয়, যেখানে তাঁর দুটি কবিতা—'তুই কি আমার দুঃখ হবি' এবং 'মানুষ, জানো কিছু?' স্থান পায়। কিন্তু পরবর্তীতে যখন তিনি গদ্য লিখতে শুরু করেন, তখন 'সমুদ্র অনেক বড়' বইটির সেই কোকিলের গল্পটি তাঁর মনে উঁকি দেয় এবং অনুপ্রাণিত করে। এই অনুপ্রেরণায় তিনি তাঁর কিশোর উপন্যাস 'কাকের নাম সাবানি' রচনা করেন, যা আখতার হুসেনের কোকিলের গল্প থেকে সরাসরি অনুপ্রাণিত। আনিসুল হক অকপটে স্বীকার করেন, আখতার হুসেনের গল্প না পড়লে হয়তো তিনি কথাসাহিত্যে কিছু করার চেষ্টাই করতেন না।
আখতার হুসেনের ছড়াগুলোও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং স্কুলের পাঠ্যবইয়ে স্থান করে নিয়েছে। তাঁর লেখা জনপ্রিয় ছড়াগুলোর মধ্যে একটি হলো—'হ্যারে খবরটা কী উড়ো, শুনতে পেলাম নিখিলপুরের চার চারটে বুড়ো'। ছড়া, গল্প, নাটক ও গানে তিনি শিশুদের জগৎকে সুন্দর ও সাহসী করে তুলেছেন। কিশোর আলো নিয়মিত তাঁর ছড়া প্রকাশ করেছে এবং কিশোর আলোর যেকোনো অনুষ্ঠানে তাঁকে সাদরে বরণ করা হতো। তিনি মহা উৎসাহে কিশোর আলোর অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নিতেন, এমনকি ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর কিশোর আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রথম আলোর সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত শিশু–কিশোর সম্মেলনেও তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য রেখেছেন।
আখতার হুসেনের অবদান বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবিস্মরণীয়। তাঁর সরলতা, শুভ্রতা এবং শিশুদের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা তাঁর লেখায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি কেবল একজন লেখক নন, তিনি একটি প্রজন্মের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং বহু লেখকের অনুপ্রেরণা। তাঁর মতো একজন গুরু ও প্রিয় মানুষের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করে গোটা সাহিত্য সমাজ। তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাদের সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে, এই প্রত্যাশা সকলের।