চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় রেলক্রসিংয়ে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় দুটি তরতাজা প্রাণ ঝরে গেছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় একটি অটোরিকশার দুই আরোহী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে যখন একটি দ্রুতগামী ট্রেন অসতর্কভাবে রেলক্রসিং পার হতে যাওয়া অটোরিকশাটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ঘটনার পর পরই স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে আসে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সাতকানিয়া এলাকার একটি রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় একটি যাত্রীবাহী ট্রেন দ্রুতগতিতে আসছিল। সে সময় একটি অটোরিকশা রেললাইন অতিক্রম করার চেষ্টা করলে ট্রেনের সঙ্গে তার ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। ট্রেনের প্রচণ্ড ধাক্কায় অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং এর কিছু অংশ ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে। অটোরিকশার ভেতরে থাকা দুই আরোহী এতটাই গুরুতর আঘাত পান যে, ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় রেলক্রসিংয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।
নিহতদের মধ্যে একজন স্থানীয় যুবদল কর্মী বলে পরিচয় পাওয়া গেছে। তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর রাজনৈতিক মহলেও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। অন্য নিহত ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, তবে তিনি ওই যুবদল কর্মীর সঙ্গী ছিলেন বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার শত শত উৎসুক জনতা এবং স্বজনরা ঘটনাস্থলে ভিড় করে। তাদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় পুলিশ এবং রেলওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে, অটোরিকশা চালকের অসতর্কতা অথবা রেলক্রসিংয়ের যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব এই দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তবে বিস্তারিত তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে তারা আশ্বস্ত করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে অরক্ষিত এবং গেটম্যানবিহীন রেলক্রসিংগুলো প্রায়শই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই রেলক্রসিংটিতে গেটম্যানের উপস্থিতি ছিল কিনা অথবা সিগন্যাল ব্যবস্থা ঠিক ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে বারবার এসব অরক্ষিত ক্রসিংয়ের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হয়, যা এমন প্রাণহানির ঘটনাকে বাড়িয়ে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণেরও রেলক্রসিং পারাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় গেট স্থাপন এবং প্রতিটি ক্রসিংয়ে প্রশিক্ষিত গেটম্যানের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে, রেললাইন পারাপারে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই দুর্ঘটনা আবারও দেশের রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনহানির ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানানো হচ্ছে যেন ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। একটি নিরাপদ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।