জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি আজ রোববার জুলাই জাতীয় সনদে সই করা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় মিলিত হচ্ছে। এই সভাটি জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে বেলা আড়াইটায় অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং পদ্ধতি নিয়ে যখন দেশজুড়ে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই এই মতবিনিময়কে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে, বিরোধী দলগুলো এই প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ায় সংবিধান সংশোধনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ের দুজন করে প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এটি কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক, যেখানে মূলত সংবিধান সংশোধন বিষয়ে দল ও জোটগুলোর মতামত জানতে চাওয়া হবে। এর আগে গত ৪ আগস্ট কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী এবং গণমাধ্যম সম্পাদকসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় আজকের এই মতবিনিময় সভার আয়োজন।
তবে, দেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি দল এই মতবিনিময়ে অংশ নিচ্ছে না বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মূল আপত্তি হলো, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে একটি প্রথাগত বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই দলগুলো মনে করে, সংবিধান সংস্কারের জন্য গণভোটের নির্দেশিত পথ অনুসরণ করা উচিত ছিল, যেখানে একটি স্বাধীন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। এই মৌলিক মতপার্থক্যের কারণে তারা সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত সরকারি কোনো উদ্যোগের অংশ হতে আগ্রহী নয় এবং বিশেষ কমিটিতেও তাদের কোনো প্রতিনিধি দেয়নি।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের লক্ষ্যে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়েছিল। দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও সে সময় বিস্তারিত আলোচনা হয়। সনদে সই করা ২৬টি দলের মধ্যে বাম ধারার চারটি দল অবশ্য এই সনদে সই করেনি। পরবর্তীতে এই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সরাসরি সংবিধান-সম্পর্কিত ছিল। এই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করে।
সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একযোগে এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। গণভোটের এই রায় অনুসারে, ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের নিয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর এই সংস্কার পরিষদ গঠন করেনি। বরং, গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে বিরোধী দল থেকে পাঁচজন প্রতিনিধি চাওয়া হলেও তারা নাম দেয়নি এবং কমিটিটিকে প্রত্যাখ্যান করে।
১১–দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু জানান, তারা আমন্ত্রণ পেলেও মতবিনিময়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার মতে, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করাই ছিল সঠিক পথ, কিন্তু তা না করে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। একইভাবে, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন উল্লেখ করেন যে, সংবিধান সংস্কার কীভাবে হবে তা গণভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হয়নি। তিনি মনে করেন, প্রথাগত পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধন করা হলে চলমান সংকটের সমাধান হবে না এবং তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনা হলেই সেখানে অংশ নেবেন।
বিশেষ কমিটির সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরকারি দল আশা করেছিল, গত ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি দেবে। তবে শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল তাদের নাম না দেওয়ায় কমিটি এখন পুরোদমে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং বিরোধীদের অংশগ্রহণ ছাড়া সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহলে চলছে নানা আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা।