বৃহস্পতিবার, 17 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

রুপসা বিলের মৎস্যজীবী হানিফের সংগ্রামী জীবন: সংকট ও আশার নতুন দিগন্ত

রুপসা বিলের মৎস্যজীবী হানিফ গরু বিক্রি করে পাওয়া অর্থ শেষ হওয়ার পর নতুন করে জীবন সংগ্রামের মুখোমুখি। ছোট্ট মেয়ের মুখে সংসারের চিন্তা শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আবার মাছ ধরতে নামেন, যেখানে বিলের দান তার জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করে। দারিদ্র্যের মধ্যেও মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন হানিফ।

শেয়ার করুন:
রুপসা বিলের মৎস্যজীবী হানিফের সংগ্রামী জীবন: সংকট ও আশার নতুন দিগন্ত

রুপসা বিলের মৎস্যজীবী হানিফের জীবনচক্রে সম্প্রতি এক নতুন বাঁক দেখা দিয়েছে। প্রায় আড়াই বছর ধরে পরম যত্নে লালন-পালন করা গরুটি তিনি বিক্রি করেছিলেন ষাট হাজার টাকায়। এই অর্থ দিয়ে ৪৫ হাজার টাকার দীর্ঘদিনের ঋণ পরিশোধের পর তার হাতে অবশিষ্ট ছিল পনেরো হাজার টাকা। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে এই সামান্য অর্থেই প্রায় দুই মাস সংসার চালিয়েছেন হানিফ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চালের ড্রাম শূন্য হয়ে আসে। ছয় বছরের ছোট্ট মেয়ে পুতুল, যে সবে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে, বাবার কাছে এসে চালের স্বল্পতার কথা জানায়, যা হানিফের মনে এক মিশ্র অনুভূতির জন্ম দেয়।

হানিফ বিস্মিত হন তার ছোট্ট মেয়ের এই অপরিণত বয়সে সংসারের প্রতি এমন গভীর চিন্তা দেখে। পুতুলের এই সচেতনতা তার কাছে আল্লাহ পাকের বিশেষ নিয়ামত মনে হয় এবং এটি তার মনে নতুন করে সংকল্প জাগিয়ে তোলে। মেয়ের প্রশ্নের জবাবে নরম কণ্ঠে তিনি বলেন, 'আমি তরারে খাওয়াইতে পারবাম নারে মা; আল্লাই তরারে খাওয়াইব।' এই কথাগুলো কেবল সান্ত্বনা ছিল না, বরং তার ভেতরের সুপ্ত ইচ্ছাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল – আবার গরু কিনে লালন-পালন করার অথবা বিলের জলে নতুন করে ভাগ্য অন্বেষণের। পুতুলের মুখে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ হানিফের হৃদয়ে এক গভীর ভালোবাসার জন্ম দেয় এবং তাকে পুনরায় কর্মচঞ্চল হওয়ার প্রেরণা যোগায়।

পুতুলের জীবন অবশ্য সহজ নয়। ছোটবেলায় কানের ভেতর ধান ঢুকে যাওয়ার কারণে তার এক কানে শোনার সমস্যা হয়, যা তাকে 'হাটকালা' নামে পরিচিত করে তোলে স্কুলের শিক্ষক ও বন্ধুদের মাঝে। এই বিড়ম্বনার মধ্যেই সে লেখাপড়া শেখে। তবে সম্প্রতি নেত্রকোনার একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে তার চিকিৎসা করানো হয়েছে এবং কানের ভেতর একটি যন্ত্র বসানোর ফলে সে এখন কিছুটা শুনতে পাচ্ছে। এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পুতুল অঙ্কে অত্যন্ত পারদর্শী, বিশেষ করে যোগ-বিয়োগে তার কোনো ভুল হয় না। তার এই মেধার ঝলক হানিফের ছেলেবেলার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, যখন তিনিও গণিতে বেশ ভালো ছিলেন, যদিও গুণ ও ভাগ তিনি ক্যালকুলেটর ছাড়া করতে পারতেন না।

মেয়ের এই মেধা দেখে হানিফের বুক গর্বে ভরে ওঠে। তিনি মনে মনে এক নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন – পুতুলকে তিনি সর্বোচ্চ শিক্ষা দেবেন। তার সংকল্প, মেয়েকে ভালো ভালো স্কুল-কলেজে পড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। এই স্বপ্ন তার জীবনে এক নতুন উদ্দীপনা নিয়ে আসে, যা তাকে বর্তমানের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে। পুতুলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার এই আকাঙ্ক্ষা হানিফের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করে এবং তাকে বিশ্বাস যোগায় যে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি তার মেয়ের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারবেন।

ঘরের চাল যেদিন সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়, সেদিন আড়াই বছরের ছেলে আবদুল বাবার কাছে বারবার 'আব্বা বিলো যাই' বলে আবদার করে। হানিফ ছেলের এই কণ্ঠে যেন আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন খুঁজে পান এবং তার কিসমতে কী আছে তা যাচাই করার উদ্দেশ্যে রুপসা বিলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। প্রায় দুই মাস স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি থাকার পর হানিফ আবার তার অন্নদাতা, শতসহস্র শাপলা ও পদ্ম ফোটা রুপসা বিলের জলে নামেন। এই বিরাট বিলটিই তার এবং তার পূর্বপুরুষদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস। পৈতৃক সূত্রেই তিনি এই বিলের সরকারি খাসজমিতে থাকা পাঁচটি মাছের খৈনের মালিক।

হানিফ তার বাবা মোতালেবের কাছ থেকে বিলে মাছ শিকারের কৌশল আয়ত্ত করেছেন। শোল, বোয়াল, রুই, কাতলা, কালবাউশ, কই, পুঁটি, টেংরা – কত বিচিত্র ও সুস্বাদু মাছের সমাহার এই রুপসা বিলে। গ্রামের অল্প কিছু মানুষের মধ্যেই হানিফ অন্যতম, যারা নিয়মিত নিজেদের বউ-বাচ্চার পাতে অন্তত কিছুটা মাছ তুলে দিতে পারেন, কারণ সবাই তার মতো বিলের 'খেলোয়াড়' নন। তার আট কাঠা ধানের জমি থাকলেও এর মধ্যে পাঁচ কাঠা রেন্টে দেওয়া। এই পাঁচ কাঠা জমি এ বছরের মধ্যেই উদ্ধার করে পরিবারের সারা বছরের খোরাকির ধান নিশ্চিত করার পাশাপাশি কিছু ধান বিক্রি করারও পরিকল্পনা রয়েছে তার।

প্রথম দিন বিলে নেমে প্রত্যাশিত মাছ না পেলেও, যা পেলেন তাতে তার ১০০ টাকা রোজগার হলো। ৫০ টাকায় এক কেজি চাল কিনে বাকি ৫০ টাকায় নিজের বিড়ি ও ছেলেমেয়ের জন্য মজা কিনে তিনি একজন সুখী মানুষের মতো রাজকীয় ভঙ্গিতে প্রসন্ন মনে বাড়ি ফেরেন। তবে আসল চমক অপেক্ষা করছিল রাতের বেলায়। রাত দশটার দিকে বিলের দিকে গিয়ে তিনি দেখেন, তার বড়শিতে একটি বড় শোল মাছ লেগেছে, যার আনুমানিক মূল্য ৪৫০ টাকা। পাশের আরেকটি বড়শিতে ছিল আরও একটি ছোট শোল, যার দাম ৫০ টাকা হতে পারে। ছিপ দিয়ে তিনি আরও ৩৫টি পুঁটি মাছ ধরেন। এই অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি তার মনে আনন্দের বন্যা বইয়ে দেয়।

রাত বারোটার দিকে ঘরে ফিরে চমৎকার এক ঘুম দিয়ে ফজরের সময় হানিফ আবার বিলে চলে আসেন। এবার এসে দেখেন তার বড়শিতে এক কেজি ওজনের একটি বোয়াল মাছ ধরা পড়েছে। এছাড়াও পাশের বড়শিগুলোতে আরও তিনটি শোল মাছ ছিল। দুটি শোল মাছ বাড়িতে খাওয়ার জন্য রেখে বাকি মাছগুলো বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন হানিফ। রুপসা বিলের এই উদার দান যেন হানিফের জীবনে নতুন করে আশা ও সংকল্পের বীজ বুনে দিয়েছে, যেখানে তার মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের সচ্ছলতাই এখন তার মূল লক্ষ্য।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ