বাংলাদেশের অন্যতম দুর্গম ও নয়নাভিরাম জলপ্রপাত আমিয়াখুম, যেখানে পৌঁছাতে প্রয়োজন হয় অদম্য সাহস ও শারীরিক সক্ষমতা। প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে ছুটে যান, কিন্তু এর পথের বিপদসংকুলতা সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা থাকে না। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী, শায়লা এ্যামিন, তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ও স্মরণীয় ট্রেকিং অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন, যা নাফাখুম-আমিয়াখুমের পথে তাদের দল প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে।
ঈদের ছুটিতে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে শায়লা একটি ট্যুর গ্রুপের সঙ্গে সায়েদাবাদ থেকে বান্দরবানের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। তাদের দলে মোট ৩৫ জন পর্যটক ছিলেন, যারা বিভিন্ন ট্যুর গ্রুপ থেকে এসেছিলেন। রাতের বাসে চকরিয়া, সেখান থেকে আলীকদম, অতঃপর চান্দের গাড়িতে থানচি পর্যন্ত তাদের যাত্রা ছিল অপেক্ষাকৃত মসৃণ। থানচি থেকেই শুরু হয় নেটওয়ার্কবিহীন এক নতুন জগতের অভিজ্ঞতা, যা তাদের আসন্ন দুর্ভোগের পূর্বাভাস দেয়।
থানচি থেকে রেমাক্রি পর্যন্ত ট্রলারে যাওয়ার কথা থাকলেও, তেল সংকটের অজুহাতে তাদের পদ্মঝিরি থেকেই ট্রেকিং শুরু করতে বলা হয়। বেলা ১টায় শুরু হওয়া এই অপ্রত্যাশিত পদযাত্রা ছিল তাদের জন্য এক বিরাট ধাক্কা। প্রথমদিকে ঝিরিপথ ধরে হাঁটা পাহাড়ি দৃশ্যের সঙ্গে বেশ উপভোগ্য মনে হলেও, দুপুরের খাবারের পর আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হয়। বিকেল ৪টার পর একের পর এক খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে ওঠা তাদের শারীরিক ও মানসিক ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে শুরু করে।
সন্ধ্যা নামার পর পথ আরও দুর্গম হয়ে ওঠে। গাইডদের আশ্বাস সত্ত্বেও, আধা ঘণ্টার পথ দুই ঘণ্টায়ও শেষ না হওয়ায় সবার মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। দলের মধ্যে পঞ্চাশোর্ধ্ব কয়েকজন সদস্য ছিলেন, যারা ট্রেকিংয়ের এমন কঠিন রূপের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না এবং আমিয়াখুমের কেবল ছবির সৌন্দর্য দেখে আকৃষ্ট হয়ে এসেছিলেন। তাদের পাশাপাশি তরুণরাও চরম ক্লান্তিতে ভুগছিলেন। ঘন অন্ধকারে টর্চের আলোয় উঁচু-নিচু খাড়া পাহাড় ও ঝিরিপথ অতিক্রম করা ছিল এক দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা। প্রায় সাত-আটটি পাহাড় অতিক্রম করে রাত সাড়ে দশটায় থুনচিপাড়ায় পৌঁছান তারা, যেখানে শায়লা এতটাই ক্লান্ত ছিলেন যে পাড়ার উঠানেই শুয়ে পড়েন।
শারীরিক যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়েও, পরদিন সকালে আমিয়াখুমের উদ্দেশ্যে পুনরায় যাত্রা করার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে জেগে ওঠেন শায়লা। ৩৫ জনের দলের মধ্যে মাত্র ১০ জন, যাদের মধ্যে শায়লাসহ দুজন নারী ছিলেন, আমিয়াখুমের পথে পা বাড়ান। বয়স্ক পুরুষ সদস্যরা তাদের এই সাহসের জন্য কিছুটা উপহাস করলেও, শায়লা ও তার সঙ্গিনীর দৃঢ় সংকল্প তাদের এগিয়ে নিয়ে যায়। শরীরের প্রতিটি কোষে ব্যথা থাকলেও, স্বপ্নের আমিয়াখুমের হাতছানি তাদের অনুপ্রাণিত করে।
দুই ঘণ্টা হাঁটার পর সামনে আসে সেই কুখ্যাত 'দেবতা পাহাড়', আমিয়াখুমের পথে সবচেয়ে বিপজ্জনক বাধা। প্রায় ১,৯০০ ফুট উঁচু এবং ৯০ ডিগ্রি খাড়া এই পাহাড় বেয়ে দড়ির সাহায্যে নামা ছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা। সামান্য ভুল মানেই নিশ্চিত খাদে পড়ে যাওয়া। এই চরম ঝুঁকি মোকাবেলা করে নিচে নেমে আসার পর ভেলাখুম পেরিয়ে অবশেষে দেখা মেলে বহু আকাঙ্ক্ষিত আমিয়াখুমের। দীর্ঘ দুই দিনের সব কষ্ট যেন মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায় এর অপরূপ সৌন্দর্য দেখে। ছবি তোলা এবং জলপ্রপাতের শীতল জলে স্নান করে ক্লান্তি ভুলে যান সবাই।
আমিয়াখুমের সৌন্দর্য উপভোগের পর দেবতা পাহাড় বেয়ে পুনরায় উপরে ওঠা ছিল আরও এক বড় চ্যালেঞ্জ। হেঁটে, বসে বা হামাগুড়ি দিয়ে তারা চূড়ায় পৌঁছান এবং সেখান থেকে পাড়ায় ফিরে আসেন। পরদিন আবার নাফাখুমের উদ্দেশ্যে যাত্রা এবং রেমাক্রি হয়ে বোট ও চান্দের গাড়িতে থানচি ফিরে আসার পরিকল্পনা ছিল। এই পুরো অভিজ্ঞতা শায়লাকে শিখিয়েছে যে, প্রকৃতি যেমন অপার সৌন্দর্য ধারণ করে, তেমনই তার কিছু ভয়ঙ্কর রূপও আছে, যা মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজন অসামান্য ধৈর্য, সাহস এবং প্রস্তুতি। এই ট্রেকিং শুধু একটি ভ্রমণ ছিল না, ছিল জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা।