বাংলাদেশের বিশিষ্ট কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে শপথ নেন। এই দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব আরও সুদৃঢ় হলো এবং বৈশ্বিক ফোরামে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হলো।
শপথ গ্রহণকালে ড. খলিলুর রহমান সততা, আনুগত্য এবং সুবিবেচনার সঙ্গে তাঁর অর্পিত দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, জাতিসংঘ সনদ এবং সভাপতির জন্য নির্ধারিত সকল নীতিমালা তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলবেন। তাঁর দায়িত্ব পালনকালে কেবল জাতিসংঘের বৃহত্তর স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং কোনো প্রকার ব্যক্তিগত বা জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে না বলে তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন।
দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা এবং স্বাধীন মনোভাব বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে ড. খলিলুর রহমান আরও স্পষ্ট করেন যে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা বহিরাগত কোনো সত্তার কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা চাইবেন না এবং এমন কোনো নির্দেশনা গ্রহণ করা থেকেও সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকবেন। তাঁর এই অঙ্গীকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাঁর নিরপেক্ষ ও পেশাদার নেতৃত্ব প্রদানের দৃঢ় ইঙ্গিত বহন করে, যা বিশ্ব শান্তি ও সহযোগিতার জন্য অপরিহার্য।
গত ২ জুন, ২০২৬ তারিখে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে ড. খলিলুর রহমান এই সম্মানজনক পদে বিজয়ী হন। তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিসকে পরাজিত করেন। নির্বাচনে মোট ১৯০টি সদস্য রাষ্ট্র অংশগ্রহণ করে, যার মধ্যে ড. খলিলুর রহমান ৯৯টি দেশের মূল্যবান ভোট পেয়েছিলেন, যেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পান ৯১টি দেশের সমর্থন। এই বিজয় বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের প্রচলিত আঞ্চলিক রোটেশন পদ্ধতি অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদটি এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের জন্য নির্ধারিত ছিল। এই নিয়ম মেনেই বাংলাদেশ থেকে ড. খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাস থেকে আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিস এই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এই বিজয় এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার সক্রিয় ভূমিকার একটি বড় প্রমাণ।
ড. খলিলুর রহমানের এই বিজয় বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, কারণ এর মাধ্যমে প্রায় চার দশক পর আবারও কোনো বাংলাদেশি প্রতিনিধি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলেন। এর আগে, ১৯৮৬-৮৭ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, যা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি করেছিল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের পরিচিতি বাড়িয়েছিল।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি প্রতি বছর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। জাতিসংঘের মোট ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যেকটির একটি করে ভোটাধিকার রয়েছে এবং সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী প্রার্থীই সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি জাতিসংঘের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমানাধিকারের প্রতীক, যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করে।
ড. খলিলুর রহমানের এই দায়িত্ব গ্রহণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং বৈশ্বিক শান্তি ও উন্নয়নে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের অঙ্গীকারকে পুনর্ব্যক্ত করে। তাঁর নেতৃত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দেশের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।