ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে তিন মাসব্যাপী এক বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক অভিযান, যার শুভ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই বিশেষ কর্মসূচি ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত ও বহু-মাত্রিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার জন্য আন্তরিক আহ্বান জানিয়েছেন, কারণ আগামী তিন মাসকে ডেঙ্গুর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে মশকনিধন কার্যক্রমের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল না হয়ে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কেবল রাসায়নিক প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং এর মূল উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করতে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে একটি ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা অপরিহার্য।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, এই তিন মাসব্যাপী কর্মসূচিতে স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। মহানগর এলাকাগুলোতে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনগুলো কার্যক্রম সমন্বয় করবে, যেখানে জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকেরা এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) স্থানীয় কার্যক্রমের সার্বিক দায়িত্বে থাকবেন। এই বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই সচেতনতামূলক অভিযানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বাংলাদেশ স্কাউটস, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), গার্ল গাইডস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের যুক্ত করা হবে। তাদের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি স্তরে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতি শনিবার এই স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও স্থাপনায় গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেবেন, যা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থলগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোকে ধ্বংস করা। একই সাথে, নাগরিকদের নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে উৎসাহিত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেছেন যে, প্রতিটি পরিবারকে তাদের বাড়ির ভেতরে ও বাইরে জমা জল পরিষ্কার করার দায়িত্ব নিতে হবে, কারণ এডিস মশা মূলত পরিষ্কার জলেই ডিম পাড়ে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছাড়া এই ব্যাপক আকারের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মাঠপর্যায়ের পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সংশ্লিষ্টদের বলেছেন, টেলিভিশনে ডেঙ্গু বিষয়ক জনসচেতনতামূলক প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা নিয়মিতভাবে তুলে ধরতে হবে। এর মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং করণীয় সম্পর্কে অবহিত করা সম্ভব হবে, যা এই অভিযানের সাফল্য নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন যে, আগামী তিন মাস বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই সময়ে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা এবং আশপাশের এলাকা নিয়মিত পরিষ্কার রাখার বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন। একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং তথ্যসচিব মাহবুবা ফারজানাসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অভিযান সফল হবে বলে সরকার আশাবাদী।