চলতি ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত এই নীতিমালায় ভর্তির আবেদন গ্রহণ, ফলাফল প্রকাশ, চূড়ান্ত ভর্তি এবং ক্লাস শুরুর সুনির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো হয়েছে। দেশের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠুভাবে ভর্তির প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য। সোমবার (২৪ আগস্ট) শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা জনসম্মুখে উন্মোচন করে, যা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, আগামী ২ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য অনলাইন আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। শিক্ষার্থীরা আগামী ১০ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত এই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের তাদের পছন্দের কলেজগুলোতে আবেদন করতে হবে। বিশেষত, যে সকল শিক্ষার্থী ভর্তি-সংক্রান্ত পুনর্নিরীক্ষণ বা পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করেছেন, তাদের ফলাফল ১২ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাওয়া গেলে তারা ওই একই তারিখে রাত ৮টা পর্যন্ত আবেদন করার সুযোগ পাবেন। একই সময়ে আবেদনকারী শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দক্রম পরিবর্তনের সুযোগও পাবেন, যা তাদের পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সম্ভাবনাকে আরও সুসংহত করবে।
একাদশে ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাছাই বা ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে না, যা পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতোই একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই সম্পূর্ণ ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এই পদ্ধতি মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ফলাফল আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় প্রকাশ করা হবে। ফলাফল প্রকাশের পর নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি নিশ্চায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভর্তি নিশ্চায়ন করতে ব্যর্থ হলে শিক্ষার্থীর নির্বাচন এবং আবেদন বাতিল বলে গণ্য হবে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশনা।
ভর্তি নিশ্চায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর, একাদশ শ্রেণিতে চূড়ান্ত ভর্তি কার্যক্রম ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি জমা দিয়ে তাদের ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সবশেষে, চলতি শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির ক্লাস আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে। এই সুনির্দিষ্ট সময়সূচি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন শুরু করার জন্য একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ প্রদান করবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সহায়তা করবে।
আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে, নীতিমালা অনুযায়ী সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট আসনের ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই আসনগুলোতে এসএসসি ও সমমানের ফলাফলের ভিত্তিতে মেধাক্রম তৈরি করে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে। অবশিষ্ট ৭ শতাংশ আসন কোটার জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ শতাংশ আসন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যাদের জন্য এবং ২ শতাংশ আসন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কোটা পদ্ধতি সামাজিক ন্যায়বিচার ও বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীগুলোর অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভর্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র বা গেজেটের সত্যায়িত কপি জমা দিতে হবে এবং ভর্তির সময় মূল কপি প্রদর্শন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা মুক্তিযোদ্ধা সনদ যথাযথভাবে যাচাই করে ভর্তি সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। যদি মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা পাওয়া না যায়, তবে সংশ্লিষ্ট আসন খালি রাখা যাবে না এবং মেধাতালিকা থেকে ওই আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করতে হবে। এই বিধানটি নিশ্চিত করবে যে কোনো আসন অযথা খালি থাকবে না এবং শিক্ষার্থীদের সুযোগ নষ্ট হবে না। উল্লেখ্য, এই কোটা পদ্ধতি শুধুমাত্র ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রযোজ্য হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য এক শতাংশ এবং মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর বা সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য এক শতাংশ আসন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কোটার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দপ্তরপ্রধানের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। যদি আবেদনকারীর সংখ্যা সংশ্লিষ্ট কোটার জন্য নির্ধারিত আসনের চেয়ে বেশি হয়, তবে ওই কোটার প্রার্থীদের মধ্যেই মেধার ভিত্তিতে ভর্তি সম্পন্ন করা হবে। এই প্রক্রিয়াটি কোটাধারীদের মধ্যেও মেধাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করবে।
সমান জিপিএ প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে মেধাক্রম নির্ধারণের জন্য সর্বমোট প্রাপ্ত নম্বরকে বিবেচনায় আনা হবে। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে গ্রেড পয়েন্ট ও প্রাপ্ত নম্বর সমতুল্য করে হিসাব করতে হবে, যাতে বিভিন্ন বোর্ডের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ন্যায্য তুলনা করা যায়। এছাড়া, বিভিন্ন সালের গ্রেড পয়েন্ট ও প্রাপ্ত নম্বর সমতুল্য করে হিসাব করার নির্দেশনাও রয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির ক্ষেত্রে সমান মোট নম্বরপ্রাপ্তদের মেধাক্রম নির্ধারণের জন্য সাধারণ গণিত ও উচ্চতর গণিত/জীববিজ্ঞানে প্রাপ্ত নম্বর বিশেষভাবে বিবেচনায় আনা হবে। যদি এরপরও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা নিরসন না হয়, তবে পর্যায়ক্রমে ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনায় এনে মেধাক্রম চূড়ান্ত করা হবে।
মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জিপিএ বা মোট নম্বরের সমতার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনা করে মেধাক্রম নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলী নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিস্তারিত নীতিমালা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে একটি স্বচ্ছ, সুসংগঠিত এবং মেধাভিত্তিক ভর্তি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এবং অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন এই নীতিমালা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করেন এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তাদের আবেদন ও ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।