মঙ্গলবার, 25 আগস্ট 2026
⚠ ব্রেকিং
রাজনীতি 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

সিলেটে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড়: আ.লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির নাশকতার মামলায় স্বদলীয় নেতার নাম!

সিলেটের বিশ্বনাথে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা নাশকতার একটি মামলায় অভিযোগকারী বিএনপি নেতা তার নিজ দলের এবং জামায়াত-শিবিরের কয়েকজন কর্মীর নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মামলার বাদী নিজেও আসামির তালিকায় নিজ দলের কর্মীদের নাম থাকার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

শেয়ার করুন:
সিলেটে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড়: আ.লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির নাশকতার মামলায় স্বদলীয় নেতার নাম!

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় এক অভিনব ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি নাশকতার মামলায় অভিযোগকারী বিএনপি নেতা তার নিজ দলের কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি জামায়াত-শিবিরের কয়েকজন নেতা-কর্মীর নামও আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই ঘটনা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে যেমন তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তেমনি রাজনৈতিক মহলেও সৃষ্টি হয়েছে গভীর রহস্য ও বিভ্রান্তি। গত ২১ আগস্ট (শুক্রবার) বিশ্বনাথ থানায় এই মামলাটি দায়ের করা হয়, যা এখন তদন্তাধীন রয়েছে এবং এর পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্বনাথ উপজেলার অলংকারি ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি মো. ইরন মিয়া, যিনি সাবান টেংরা গ্রামের মৃত আব্দুল আলীর ছেলে, ৯২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৬০-৭০ জনকে আসামি করে এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহারে আওয়ামী লীগের বিশ্বনাথ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহ আসাদুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমদ, সাবেক সহসভাপতি কবির আহমদ কুব্বার, যুগ্ম সম্পাদক মকদ্দুছ আলী এবং পৌর আওয়ামী লীগের আহবায়ক জালাল উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতার নাম রয়েছে। তবে বিস্ময়করভাবে, আসামিদের তালিকায় বিএনপির ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং জামায়াত-শিবিরের কয়েকজন নেতার নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে, গত ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় আসামিরা রামপাশা ইউনিয়নের বিশ্বনাথ লামাকাজী পাকা সড়কে টায়ারে অগ্নিসংযোগ করে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন এবং দেশবিরোধী স্লোগান দেন। এছাড়াও, এতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতি করাসহ এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ধরনের গুরুতর অভিযোগের সাথে নিজ দলের কর্মীদের নাম জড়িয়ে যাওয়া স্থানীয় বিএনপির মধ্যে ব্যাপক অস্বস্তি তৈরি করেছে এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা অন্য কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

আসামিদের তালিকায় নাম থাকা এখলাছ মিয়া, যিনি অলংকারি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক, এই মামলায় তার নাম অন্তর্ভুক্তির খবরে চরম বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, তার প্রতিবেশীর সঙ্গে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলছে এবং লোকমুখে শুনেছেন যে তাকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীর তালিকায় ঢুকিয়ে মামলায় জড়ানো হয়েছে। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে তিনি এর সত্যতা পেয়েছেন। এখলাছ মিয়া আরও বলেন যে, তিনি ছাড়াও বিএনপির আরও কয়েকজন কর্মীকেও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি বিএনপির দায়িত্বশীল ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তারা তাকে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। এমনকি মামলার বাদীর সঙ্গেও তার কথা হয়েছে, যেখানে বাদী নিজেও তার নাম কীভাবে আসামির তালিকায় এলো, তা জানেন না বলে দাবি করেছেন।

শুধু বিএনপির কর্মীই নয়, জামায়াত-শিবিরের বেশ কয়েকজন সদস্যকেও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। ৮৮ নম্বর আসামি রনি মিয়া খাজাঞ্চি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রশিবিরের সভাপতি এবং ৮৬ নম্বর আসামি রামপাশা ইউনিয়নের আমতৈল গ্রামের মৃত আব্দুল কাদিরের ছেলে রেনু মিয়া জামায়াতের সক্রিয় কর্মী হিসেবে চিহ্নিত। বিশ্বনাথ উপজেলা জামায়াতের আমির নিজাম উদ্দিন সিদ্দিকী এই বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, জামায়াত কর্মী রেনু মিয়া ও ছাত্রশিবিরের সভাপতি রনি মিয়াকে এই মামলায় সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে আসামি করা হয়েছে এবং এ ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন, যা মামলার রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।

এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিষয়ে বিশ্বনাথ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, গত ১৯ আগস্ট (বুধবার) রাতে ইরন মিয়া বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন এবং বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তবে, মামলার বাদী মো. ইরন মিয়া নিজেই মামলার বিষয়ে তার অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আমি এসবের কিছুই জানি না। জানতে হলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমি দলের একজন হিসেবে সই দিয়েছি।” বাদীর এই ধরনের বক্তব্য মামলার স্বচ্ছতা এবং এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। এটি কি কোনো রাজনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নাকি অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থেকে দায়ের করা হয়েছে, তা নিয়ে চলছে জোর জল্পনা-কল্পনা।

বিশ্বনাথ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিলু মিয়াও এই বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে মামলার বাদীর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলতে পারবেন।” এমন পরিস্থিতিতে, মামলার বাদী, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং আসামিদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একটি নাশকতার মামলার মতো গুরুতর বিষয়ে বাদীর অজ্ঞতা এবং নিজ দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের ঘটনা স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এই মামলার তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং এর পেছনের রহস্য উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ঘটনা বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ