মঙ্গলবার, 25 আগস্ট 2026
⚠ ব্রেকিং
রাজনীতি 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

সংসদীয় অর্থ কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন: সরকারদলীয় সদস্যদের ‘অলংকারিক’ ভূমিকার অভিযোগ হাসনাত আবদুল্লাহর

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে সরকারদলীয় কতিপয় সদস্য ‘অলংকারিক’ হিসেবে দেখছেন বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর মতে, কমিটির যথাযথ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডাগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সংসদীয় জবাবদিহিতার ওপর প্রশ্ন তুলেছে।

শেয়ার করুন:
সংসদীয় অর্থ কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন: সরকারদলীয় সদস্যদের ‘অলংকারিক’ ভূমিকার অভিযোগ হাসনাত আবদুল্লাহর

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সরকারদলীয় কয়েকজন সদস্য এই গুরুত্বপূর্ণ কমিটিকে কেবল ‘অলংকারিক’ হিসেবে বিবেচনা করছেন, যার ফলস্বরূপ কমিটি তার নির্ধারিত ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। গত রবিবার (২৩ আগস্ট, ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে তিনি এই গুরুতর মন্তব্য করেন, যা দেশের সংসদীয় প্রক্রিয়া ও আর্থিক সুশাসনের ক্ষেত্রে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হয়। হাসনাত আবদুল্লাহর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত সংস্কার, দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা বৃদ্ধিসহ মোট চারটি বিষয় ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অর্থমন্ত্রী ও এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও, সরকারদলীয় কয়েকজন সদস্যের কথিত অসহযোগিতার কারণে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান। এই অচলাবস্থা সরকারের আর্থিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগের তীর বিশেষভাবে চিফ হুইপের দিকেও ছিল। তিনি বলেন, চিফ হুইপ কমিটির সভাপতি না হয়েও অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’ করেছেন। তাঁর মতে, সরকারদলীয় সদস্যরা বৈঠকে আন্তরিকতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং কমিটির কাজকে গুরুত্বের সঙ্গে নেননি, বরং এটিকে একটি আনুষ্ঠানিক বা অলংকারিক সভা হিসেবেই দেখেছেন। এই ধরনের হস্তক্ষেপ ও নিষ্ক্রিয়তা সংসদীয় কমিটির স্বাধীন কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার পথ রুদ্ধ করে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

হাসনাত আবদুল্লাহ আরও উল্লেখ করেন যে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জাতীয় সংসদে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল, যেখানে সরকারদলীয় কয়েকজন সদস্য ‘প্রস্তুত ছিলেন না’ বলে জানিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বৈঠকেও একই চিত্র দেখা যাওয়ায় কমিটির উদ্দেশ্য এবং সরকারদলীয় সদস্যদের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থমন্ত্রী আন্তরিকভাবে ইতিবাচক অবস্থান নিলেও, এজেন্ডাগুলোতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারা সংসদীয় কার্যক্রমে একটি হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরে।

কমিটির বৈঠকে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়, যার মধ্যে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বন্দর, ব্যাংক এবং এনবিআরের মধ্যে এই ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি হলে তথ্য আদান-প্রদান সহজ হবে এবং ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত হবে বলে হাসনাত আবদুল্লাহ জানান। এছাড়াও, করের আওতা বাড়ানো, কমলাপুর ডিপোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার বিষয়েও এনসিপির এই নেতা বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করেন, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সুষ্ঠু ব্যবসার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

বৈঠকে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রথমত, হিসাবরক্ষণ ও আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক ও কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে জবাবদিহি বৃদ্ধি পেলে কাজের দক্ষতা ও কার্যকারিতা আরও বাড়বে বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি প্রতিরোধে সরাসরি যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। এই পদক্ষেপগুলো কেবল দুর্নীতি দমন নয়, বরং একটি টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত আর্থিক কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে চিহ্নিত বা শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি যে প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতি সংঘটিত হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থাকেই পরিবর্তন বা অপসারণ করার ওপর বৈঠকে গুরুত্বারোপ করা হয়। এর ফলে ব্যবসায়ীদের ব্যয় ও হয়রানি কমবে, ব্যবসার পরিবেশ সহজ হবে এবং একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে বলে জানানো হয়। এছাড়াও, সরকারের ব্যয় নির্বাহে এনবিআরের সক্ষমতা, কর-জিডিপি অনুপাতের ব্যবধান কমাতে গৃহীত পদক্ষেপ এবং এনবিআরের সাংগঠনিক কাঠামো নিরূপণ ও করণীয় বিষয়ে এনবিআরের পক্ষ থেকে একটি বিস্তারিত প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হয়। উপস্থাপিত বিষয়সমূহের ওপর কমিটির সদস্যরা সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশ নেন এবং নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

উক্ত বৈঠকে কমিটির সদস্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি, সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, মো. শাহাদাত হোসেন, মো. সাইফুল আলম এবং সৈয়দ জয়নুল আবেদীনসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন। সংসদীয় কমিটির এই ধরনের অচলাবস্থা দেশের আর্থিক নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে কিনা, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। হাসনাত আবদুল্লাহর এই অভিযোগ সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা এবং সরকারদলীয় সদস্যদের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, যা দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ