গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি দৃষ্টিনন্দন সেতু দীর্ঘ তিন বছর ধরে কোনো কাজে আসছে না। সংযোগ সড়কের অভাবে সেতুটি যানচলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা যায়নি, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় হওয়া বিশাল অঙ্কের অর্থ এভাবে অব্যবহৃত পড়ে থাকায় জনমনে অসন্তোষ ও হতাশা বিরাজ করছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ জনদুর্ভোগ লাঘবের উদ্দেশ্যে ২০২১ সালে শ্রীপুরের বরমী বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ধাত্রী নদীর ওপর প্রায় ৯৮ মিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করে। তৎকালীন সরকার প্রায় ১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের উদ্বোধন করে। সেতুটির নির্মাণকাজ দুই বছর দশ মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হয়, যা দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল।
সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও, এর সংযোগ সড়ক নির্মাণে দেখা দেয় জটিলতা। সেতুর উত্তর পাশে ১ একর ৩৭ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও, এই সংক্রান্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতির কারণে ঠিকাদার সংযোগ সড়ক নির্মাণ শুরু করতে পারেননি। ফলে নির্মাণ শেষ হওয়ার তিন বছর পরও আধুনিক এই সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা যায়নি, যা এর মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করছে।
যান চলাচল না থাকায় বর্তমানে সেতুটি এক অদ্ভুত চিত্র ধারণ করেছে। এর ওপর বসে সাপ্তাহিক হাট, যেখানে কাঠ চেরাই করা হয় এবং ধান ও কাঁঠালের মতো কৃষি পণ্য বেচাকেনা চলে। এমনকি সেতুর পূর্বপাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় স্থানীয়রা বালুর বস্তা ফেলে পায়ে হেঁটে চলাচলের একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে এবং পথচারীদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন আকাশ বাণীকে জানান, এই পথ দিয়ে প্রতিদিন ময়মনসিংহ, গফরগাঁও, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। নতুন সেতুটি অব্যবহৃত থাকায় সবাইকে পুরোনো, জরাজীর্ণ একটি সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মালবাহী ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান উঠলেই পুরোনো সেতুটি ভয়ে কাঁপতে থাকে এবং যেকোনো মুহূর্তে সেটি ধসে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।
পাশের কাওরাইদ এলাকা থেকে বরমী বাজারে পাইকারি মালামাল কিনতে আসা মুদিদোকানি মিলন হোসেন জানান, শতবর্ষী এই বরমী বাজার থেকে পাইকারি দরে পণ্য কিনে তিনি খুচরা বিক্রি করেন। বাজারে আসা-যাওয়ার পথে ভয়াবহ যানজটে পড়তে হয়। পুরোনো সেতুতে ছোট ছোট একাধিক গাড়ি উঠলে সেটি কাঁপতে শুরু করে, যা এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন সেতুটি চালুর দাবি জানান, যা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনকে স্বাভাবিক করবে।
বরমীর আরেক বাসিন্দা আল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অব্যবহৃত সেতুতে লাগানো বৈদ্যুতিক বাতি, বিভিন্ন ধরনের নাট-বল্টু মাদকসেবীরা খুলে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। তিনি মনে করেন, সেতুটি চালু থাকলে এ ধরনের সুযোগ তারা পেত না এবং সরকারি সম্পদের এমন অপচয় রোধ করা যেত। অব্যবহৃত থাকার কারণে সেতুটির রক্ষণাবেক্ষণেও সমস্যা হচ্ছে এবং এর কাঠামোগত ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
এ বিষয়ে গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ আকাশ বাণীকে জানান, জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণেই পূর্বের ঠিকাদার সেতু নির্মাণকাজ শেষ করলেও সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে পারেননি। সংযোগ সড়ক বাদে তাদের বাকি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করে সেতুতে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে যান চলাচল উপযোগী করা হবে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভুঁইয়াও এই বিষয়ে আশ্বস্ত করে বলেন, সেতুটিতে যান চলাচলের জন্য উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়েছে এবং বাকি কাজ খুব শিগগিরই শুরু হবে বলে তিনি জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দ্রুততম সময়েই এই সমস্যার সমাধান হবে এবং জনগণ এর সুফল ভোগ করতে পারবে।
১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আধুনিক সেতুটি দীর্ঘ তিন বছর ধরে অব্যবহৃত থাকায় একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে স্থানীয়দের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে জরুরি যাতায়াত পর্যন্ত সবকিছুতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোটি জনসেবায় নিয়োজিত হবে এবং অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে, এমনটাই প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।