বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের একজন অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান নাট্যকার তানিন রহমান আর নেই। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট ২০২৬) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার আকস্মিক প্রয়াণে দেশের নাট্যাঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক উপহার দিয়ে দর্শকদের মন জয় করা এই গুণী মানুষটির চলে যাওয়া যেন শিল্পকলার এক অপূরণীয় ক্ষতি।
পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, তানিন রহমান দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। তার চিকিৎসার জন্য মিরপুর কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানে কিডনি প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বুধবার তার অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়। সফল অস্ত্রোপচারের পর তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছিল, যেখানে চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখছিলেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত, বৃহস্পতিবার আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হঠাৎ করেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং সেখানেই তার জীবনাবসান ঘটে। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে চিরতরে বিদায় নেন এই সৃজনশীল নাট্যকার।
তানিন রহমানের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন জনপ্রিয় নির্মাতা মাহমুদুর রহমান হিমি। বৃহস্পতিবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তায় তিনি লেখেন, 'আমাদের সবার প্রিয় তানিন রহমান ভাই আর নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।' হিমির এই পোস্ট মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে এবং নাট্যাঙ্গনের সহকর্মী ও ভক্তদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়। অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্বও তানিনের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তানিন রহমানের লেখা অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন অপূর্ব, তাই তার সঙ্গে তানিনের ছিল এক নিবিড় পেশাদারী সম্পর্ক।
জিয়াউল ফারুক অপূর্ব তার শোকবার্তায় উল্লেখ করেন, 'আমার অসংখ্য নাটকের লেখক তানিন রহমান আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তানিন রহমানের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত। অসংখ্য নাটকের গল্প ও চিত্রনাট্যে তার সঙ্গে কাজ করার স্মৃতি সবসময় মনে থাকবে।' অপূর্ব আরও বলেন যে, তানিনের লেখনী তার অভিনয় জীবনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। অন্যদিকে, নির্মাতা আশিকুর রহমানও তানিনের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন এবং তার অসুস্থতার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন। আশিকুর রহমানের সঙ্গে তানিনের কাজের পরিকল্পনা থাকলেও, তা আর বাস্তবায়িত হওয়ার সুযোগ পেল না, যা তাকে আরও ব্যথিত করেছে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে টেলিভিশন নাটকের গল্প ও চিত্রনাট্য রচনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন তানিন রহমান। তার লেখনী দর্শকদের কাছে নিয়ে এসেছিল হাসি, কান্না, প্রেম, বিচ্ছেদ আর মানবিক সম্পর্কের এক দারুণ মিশ্রণ। সহজ-সরল গল্পের বুননে তিনি ফুটিয়ে তুলতেন জীবনের গভীর দর্শন, যা দর্শকদের মন ছুঁয়ে যেত। দেশের জনপ্রিয় অনেক অভিনয়শিল্পী তার লেখা নাটকে অভিনয় করে দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছেন। তার নাটকগুলো শুধু বিনোদনই দিত না, বরং সমাজের নানা দিক ও মানবিক মূল্যবোধকেও তুলে ধরত, যা তাকে একজন ব্যতিক্রমী নাট্যকার হিসেবে পরিচিতি দিয়েছিল।
তানিন রহমানের উল্লেখযোগ্য নাটকের তালিকা বেশ দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ। তার জনপ্রিয় কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে – 'নিয়তি', 'মেঘের গল্প', 'আবারও', 'এই পথ যদি না শেষ হয়', 'লাল রঙা স্বপ্ন', 'শত ডানার প্রজাপতি', 'সেই ছেলেটা', 'তোমায় ভালোবেসে', 'প্রেম তুমি', 'ইন আ রিলেশনশিপ', 'এতটা ভালোবাসি', 'ভালোবাসার ফানুশ', 'নো' ও 'উৎসর্গ'। প্রতিটি নাটকই তার স্বতন্ত্র লেখনী এবং গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার স্বাক্ষর বহন করে। এই নাটকগুলো আজও অসংখ্য দর্শকের হৃদয়ে গেঁথে আছে এবং ভবিষ্যতে তার কর্মের অমর স্মারক হয়ে থাকবে।
তানিন রহমানের আকস্মিক মৃত্যুতে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সহকর্মী, অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা ও ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছেন। তার সৃজনশীল কাজ এবং নাটকের প্রতি তার একনিষ্ঠ ভালোবাসা তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। অগণিত দর্শকের ভালোবাসায় তিনি তার লেখা গল্প ও চিত্রনাট্যের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। শিল্প ও সংস্কৃতির এই অঙ্গনে তার অবদান আগামী প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।