মঙ্গলবার, 25 আগস্ট 2026
⚠ ব্রেকিং
তারকা জীবন 🇧🇩 বাংলা

‘মরারও সময় নেই আম্মা’: সালমান শাহের শেষ কথা আজও কাঁদায় মা নীলা চৌধুরীকে

কিংবদন্তি অভিনেতা সালমান শাহের মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরেও তার মা নীলা চৌধুরী ছেলের স্মৃতিতে কাতর। এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেছেন মৃত্যুর আগের দিন সালমানের বলা শেষ কথাগুলো—'মরারও সময় নেই আম্মা'—যা আজও তাকে গভীর শোকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এক মায়ের জীবনে সন্তানের অকাল মৃত্যুর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের মর্মস্পর্শী কাহিনি।

শেয়ার করুন:
‘মরারও সময় নেই আম্মা’: সালমান শাহের শেষ কথা আজও কাঁদায় মা নীলা চৌধুরীকে

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র সালমান শাহ। তার আকস্মিক প্রয়াণের প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও, তার স্মৃতি আজও অমলিন। তবে এই দীর্ঘ সময়েও যিনি তার শোক থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বের হতে পারেননি, তিনি হলেন সালমানের মা নীলা চৌধুরী। সময়ের ব্যবধানে তার কষ্ট যেন আরও গভীর হয়েছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নীলা চৌধুরী তার প্রিয় পুত্র ইমনের শেষ কথাগুলো স্মরণ করতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, কখনো ক্ষণিকের জন্য নীরব হয়ে যান, আবার কখনো কান্না চাপিয়ে ধীরে ধীরে উত্তর দেন ছেলের সঙ্গে হওয়া শেষ কথোপকথনের।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন সালমান শাহ। এর ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ৫ সেপ্টেম্বর, মায়ের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল তার। এই দীর্ঘ ত্রিশ বছর পেরিয়ে গেলেও, সেই কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ আজও নীলা চৌধুরীর কানে বাজে। তিনি স্মরণ করেন, কীভাবে তিনি ইমনকে তাদের সঙ্গে সিলেট যেতে অনুরোধ করেছিলেন। নীলা চৌধুরী বলেন, ‘আগের দিন আমি ইমনকে বলেছিলাম, ইমন, তুমিও আমাদের সঙ্গে সিলেট চলো। তাহলে তোমার একটু বিশ্রাম হবে। দুই-তিন দিন সিলেটে কাটিয়ে আসলে তোমার ভালো লাগবে।’

কিন্তু কাজের প্রতি অসাধারণ দায়বদ্ধতা এবং অসংখ্য মানুষের বিনিয়োগের কথা ভেবে সালমান তখন মাকে সিলেট যেতে পারেননি। তিনি মাকে বলেছিলেন, ‘এত মানুষের লগ্নি আমার কাছে। বিশ্রাম তো দূরে থাক, আমার মরারও সময় নেই আম্মা।’ এই কথাগুলো বলতে গিয়ে আজও তার মায়ের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘যে ছেলে আগের দিন বলে মরারও সময় নেই, সেই ছেলে পরের দিন সকালে আত্মহত্যা করে ফেলে, এটা কেউ বিশ্বাস করবে?’ এই প্রশ্নটি যেন তার দীর্ঘদিনের চাপা কষ্টেরই বহিঃপ্রকাশ।

সেই দিন সালমান মায়ের সঙ্গে দাদাবাড়ি যাননি। বরং মাকে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং ক্যারিয়ার নিয়ে তার ভাবনার কথা বুঝিয়ে বলেছিলেন। নীলা চৌধুরী জানান, ‘ইমন আমাকে বুঝিয়ে বলল, “মা, এত মানুষের লগ্নি আমার কাছে। বিশ্রাম তো দূরে থাক, আমার মরারও সময় নেই আম্মা। তার চেয়ে তুমি সিলেট থেকে ঘুরে আসো। পরে তোমাকে নিয়ে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক যাব। এক মাসের ভ্রমণে যাব। তখন এক মাস শুধুই বিশ্রাম নেব।”’ সালমানের এই শেষ কথাগুলো আজও টেলিফোনের ওপাশে ফুঁপিয়ে কাঁদতে বাধ্য করে নীলা চৌধুরীকে। তার মুখ দিয়ে কিছুক্ষণ কোনো কথা বের হয় না, যেন সময় থমকে দাঁড়ায়। কথার ফাঁকে বারবার উচ্চারিত হয় একটি নাম, ‘আমার ইমন।’

ছেলের সঙ্গে সেই এক মাসের ভ্রমণ আর কখনোই হয়নি। সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাংককের পথে মায়ের হাত ধরে হাঁটা হয়নি ইমনের। থেকে গেছে শুধু সেই অসমাপ্ত পরিকল্পনা আর শেষ কথাগুলো। ছেলের মৃত্যুর এত বছর পরও সেই শোক থেকে বের হতে পারেননি নীলা চৌধুরী। বরং সময় যত গড়িয়েছে, স্মৃতিগুলো যেন আরও গভীর হয়েছে, কখনো লন্ডনের বাসায় তাকে একাকী করেছে, মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ছেলের শেষ ইচ্ছা পূরণ হলো না। এত কিছু বলার পর কি আমি ঘুমাইতে পারি? আমার ঘুম সেদিনই শেষ। ছেলেকে ছাড়া আমার ঘুম আসে না।’ একজন মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যুর শোক হয়তো সত্যিই কখনো পুরোনো হওয়ার নয়।

সালমান শাহ ও তার মায়ের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নীলা চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান তার জীবনের প্রায় সবকিছুই মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন। মাকে কিছু না বলে থাকতে পারতেন না। তিনি বলেন, ‘আমি সালমানের মাধ্যমেই সংসারের সবকিছু জানতাম। কী করছে, কোনো বন্ধুরা আসছে, কোনো সিনেমা করছে। ও সবই আমাকে বলত। মায়ের কাছে কিছু গোপন করত না। আর না বললে বুঝতে পারতাম সে মানসিকভাবে অস্থির আছে, ভালো নাই।’ একবার সালমানের হাতে ও পিঠে বেশ কিছু কামড়ের দাগ দেখে মা জানতে চেয়েছিলেন। মায়ের প্রশ্ন এড়িয়ে যাননি সালমান। শিশুর মতো সরলভাবে মাকে সবকিছু বলেছিলেন। নীলা চৌধুরীর কথায়, ‘ইমন শুটিং করে বাসায় এসে মানসিক অশান্তিতে থাকত। সামিরা তাকে নানাভাবে হয়রানি করত। বাসায় সে কখনোই শান্তি পেত না।’

শুটিংয়ে তারকা ছেলে সালমান শাহ কেমন ছিলেন, সেই প্রসঙ্গে নীলা চৌধুরী বলেন, ‘আমার ছেলেকে ভদ্রতা শিখিয়েছি। সে কোন পরিবারের জানত। যে কারণে কখনোই কাউকে অসম্মান করত না।’ মায়ের স্মৃতিতে সালমান শুধু জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন না, ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন মানুষ। নীলা চৌধুরী বলেন, ‘সাদামনের মানুষ বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা–ই ছিল ইমন। কারও কষ্ট সে দেখতে পারত না। ইমন মিডিয়ার পরিচিত মানুষদেরও নিয়মিত খোঁজ নিত। কে কেমন আছেন, কার কী সমস্যা—এসব খবরও জানত। যারা অসচ্ছল, তাদের সাহায্য করত। তাদেরও কাজের সুযোগ করে দিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইমন কারও কষ্ট দেখতে পারত না। আর শুটিংয়ে কে তারকা, কে এক্সট্রা, ইমন কোনো দিন ভেদাভেদ করত না। কাউকে ছোট করে দেখেনি। অনেক গরিব মেয়ে ছিল, যারা অভিনয় করতে না পারলে খেতে পারে না। তাদেরও ইমন কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। যাকে দরকার, তাকে দিয়েই ইমন কাস্টিং করিয়ে নিত।’

ব্যক্তিজীবনে মা-ছেলের এই গভীর সম্পর্ক এবং সালমানের মানবিক গুণাবলী আজও তার মায়ের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। চলচ্চিত্র জগতে তার অবদান অনস্বীকার্য হলেও, একজন মায়ের কাছে তিনি কেবলই তার প্রিয় ‘ইমন’, যার অকাল প্রয়াণ আজও তার জীবনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে রেখেছে। সময়ের কাঁটা ঘুরলেও, এই শোকের কোনো উপশম নেই, কেবল স্মৃতিতে বেঁচে আছেন তার ছেলে, যার শেষ কথাগুলো আজও তার মাকে কাঁদায়।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ