মার্কিন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কঠোর নির্দেশের পর শীর্ষস্থানীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংস্থা অ্যানথ্রপিক তাদের অত্যাধুনিক এআই মডেল, ফেইবল ৫ এবং মিথোস ৫-এ বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছে। সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক এই সংস্থাটি শুক্রবার (১৩ জুন, ২০২৬) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে তাদের এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এই আকস্মিক নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের দীর্ঘদিনের বিরোধে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা এ বছরের শুরুতে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলির তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাব্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই দানা বাঁধছিল।
এই পদক্ষেপ অ্যানথ্রপিকের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ সংস্থাটি চলতি বছরের শেষের দিকে শেয়ারবাজারে তাদের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবনা (আইপিও) নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এই আইপিও-এর মাধ্যমে সংস্থাটি প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার মূল্য অর্জন করতে পারতো। অ্যানথ্রপিক তাদের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করেছে যে, তারা একটি সরাসরি নির্দেশ পেয়েছে যার ফলে তাদের ক্লড ফেইবল ৫ এবং ক্লড মিথোস ৫ মডেলগুলি বিশ্বের সমস্ত বিদেশি নাগরিকদের জন্য অবরুদ্ধ করতে বলা হয়েছে। এই মডেল দুটি ক্লড এআই মডেলের নবীনতম সংস্করণ, যা গত ৯ জুন উন্মোচন করা হয়েছিল। ফেইবল ৫ সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপকভাবে উপলব্ধ, যেখানে মিথোস ৫ মূলত যাচাইকৃত সংস্থাগুলির জন্য সংরক্ষিত।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বা বাইরে থাকা সমস্ত বিদেশি নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য হবে, এমনকি অ্যানথ্রপিকের বিদেশি কর্মচারীরাও এর আওতায় পড়বেন। তবে, নির্দেশিকা সম্পূর্ণরূপে মেনে চলার জন্য সংস্থাটি আপাতত সকল গ্রাহকের জন্য প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিয়েছে। অ্যানথ্রপিকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমাদের ধারণা, [মার্কিন] সরকার বিশ্বাস করে যে তারা ফেইবল মডেলকে বাইপাস বা ‘জেলব্রেকিং’ করার একটি পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হয়েছে।” যদিও অ্যানথ্রপিকের নিজস্ব পরীক্ষায় কেবল কিছু পরিচিত ত্রুটি পাওয়া গেছে যা তারা “সামান্য দুর্বলতা” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এই নির্দেশিকা মেনে চললেও অ্যানথ্রপিক মার্কিন সরকারের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে। সংস্থাটি যুক্তি দিয়েছে যে, সরকারের এই আবিষ্কার “লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে প্রকাশিত একটি বাণিজ্যিক মডেল প্রত্যাহার করার কারণ হওয়া উচিত নয়।” অ্যানথ্রপিক আরও সতর্ক করে দিয়েছে যে, যদি এই নিয়মটি সমস্ত এআই প্ল্যাটফর্মে প্রয়োগ করা হয়, তবে “আমরা বিশ্বাস করি এটি সমস্ত ফ্রন্টিয়ার মডেল প্রদানকারীদের জন্য সমস্ত নতুন মডেলের উন্মোচনকে মূলত থামিয়ে দেবে।” তাদের মতে, এই ধরনের বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের উদ্ভাবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
মার্কিন সরকারের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের সম্পর্ক এ বছর আরও খারাপ হয়ে যায় যখন সংস্থাটি তাদের এআই মডেলগুলি সামরিক নজরদারি এবং সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত অস্ত্র ব্যবস্থার জন্য ব্যবহার করার অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। এর প্রতিক্রিয়ায়, পেন্টাগন অ্যানথ্রপিককে একটি সরবরাহ শৃঙ্খল ব্ল্যাকলিস্টে যুক্ত করে, যা চলতি বছরের শেষের দিকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে এবং এটি সংস্থাটির ফেডারেল চুক্তিগুলিকে মারাত্মকভাবে সীমিত করতে পারে। এই সর্বশেষ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এআই সংস্থাটির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বড় পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস এই আদেশকে “অস্বাভাবিকভাবে ব্যাপক” বলে বর্ণনা করেছে। তারা উল্লেখ করেছে যে, এই আদেশ কানাডা বা যুক্তরাজ্যের মতো মিত্র দেশগুলিতে কর্মরত অ্যানথ্রপিকের কর্মচারীদেরও এআই মডেলগুলি ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে পারে, যা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। এর আগে এই মাসেই, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ স্বাক্ষর করেছিলেন, যেখানে জনসমক্ষে প্রকাশের এক মাস আগে পর্যন্ত উন্নত এআই সিস্টেমগুলির জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির জন্য ফেডারেল যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
এখন পর্যন্ত, মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণগুলি মূলত এআই চিপস এবং হার্ডওয়্যারকে লক্ষ্য করে ছিল, কিন্তু এআই মডেলগুলিতে বিদেশি প্রবেশাধিকার সীমিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য নীতিগত পরিবর্তন। এই নিষেধাজ্ঞা অ্যানথ্রপিকের আসন্ন আইপিও পরিকল্পনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা ২০২৬ সালের শরৎকালেই প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যায়নের কাছাকাছি হতে পারতো। এই ঘটনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং উদ্ভাবন ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।