গণিত জগতে নোবেল পুরস্কারের সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত ফিল্ডস মেডেল ২০২৬ সালের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি চার বছর পর পর ৪০ বছরের কম বয়সী তরুণ গণিতবিদদের প্রদান করা এই সম্মাননা এবার চারটি যুগান্তকারী গবেষণার জন্য চারজন মেধাবী বিজ্ঞানীকে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত গণিতবিদদের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সম্মেলন, ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব ম্যাথমেটিশিয়ানস-এ গত ২৩ জুলাই (বাংলাদেশ সময় ২৪ জুলাই) এই ঘোষণা আসে, যা বিশ্বজুড়ে গণিতপ্রেমীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
ফিল্ডস মেডেলের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। কানাডীয় গণিতবিদ জন চার্লস ফিল্ডসের উদ্যোগে ১৯৩৬ সালে এই পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল তরুণ গণিতবিদদের অসাধারণ কাজকে স্বীকৃতি জানানো এবং ভবিষ্যতে আরও গভীর গবেষণায় তাঁদের উৎসাহিত করা। নোবেল পুরস্কার যেখানে প্রতি বছর দেওয়া হয়, সেখানে ফিল্ডস মেডেলের দুর্লভতা এটিকে আরও অনন্য করে তুলেছে। মাত্র দুই থেকে চারজন প্রতি চার বছরে এই সম্মাননা লাভ করেন, যা গণিত গবেষণায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। এই পুরস্কার শুধু অতীতের কাজের স্বীকৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতের গবেষণার জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবেও কাজ করে।
এবারের বিজয়ীদের মধ্যে অন্যতম হলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ ইউ ডেং। তাঁর গবেষণার মূল বিষয়বস্তু পদার্থবিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন জগৎকে এক সুতোয় গাঁথা। পদার্থবিজ্ঞানে আমাদের পরিচিত বৃহৎ জগৎকে ম্যাক্রোস্কোপিক এবং পরমাণুর অভ্যন্তরীণ অতি ক্ষুদ্র জগৎকে মাইক্রোস্কোপিক বলা হয়। এই দুই জগতের নিয়মকানুন সাধারণত সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। ডেং এবং তাঁর সহকর্মীরা এই দুটি ভিন্ন ক্ষেত্রকে একত্রিত করার এক অসাধারণ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যা পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক বোঝাপড়াকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ইউ ডেংয়ের কাজটি আরও সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যেমন, স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে দর্শকরা যখন সম্মিলিতভাবে 'ওয়েভ' তৈরি করে, তখন পুরো গ্যালারির ঢেউটি হলো ম্যাক্রোস্কোপিক রূপ। কিন্তু একজন নির্দিষ্ট দর্শক কীভাবে হাত তুলছেন বা বসছেন, সেটি হলো মাইক্রোস্কোপিক রূপ। ডেং মূলত একটি একক বস্তুকণার গতিবিধি বিশ্লেষণ করে পুরো গ্যাসের আচরণ কেমন হবে তা নির্ণয় করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ১৯০০ সালে বিখ্যাত গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্টের দেওয়া একটি শতাব্দীপ্রাচীন ধাঁধার সমাধান করেছেন। এটি পদার্থবিজ্ঞানের নির্ভুলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এক বিশাল অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এবারের ফিল্ডস মেডেল বিজয়ীদের মধ্যে আরেকটি বড় চমক হলেন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের হোং ওয়াং। ফিল্ডস মেডেলের প্রায় ৯০ বছরের ইতিহাসে তিনি মাত্র তৃতীয় নারী হিসেবে এই সম্মাননা পেলেন, যা নারী গণিতবিদদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। তিনি পাঁচ দশকের পুরোনো কাকায়া কনজেকচারের সমাধান করেছেন। এই সমস্যাটি হলো, একটি বিশাল বাঁশ বা সুচকে একটি ছোট ঘরের মধ্যে শূন্যে ভাসিয়ে এমনভাবে ঘোরানোর জন্য সর্বনিম্ন কতটুকু জায়গার প্রয়োজন হবে, যাতে এটি সব দিকে মুখ করতে পারে।
দ্বিমাত্রিক বা সমতলের জন্য এই সমস্যার সমাধান আগেই হয়েছিল, কিন্তু ত্রিমাত্রিক জগতে, অর্থাৎ বাতাসে ভাসমান অবস্থায় এর হিসাব মেলানো যাচ্ছিল না। হোং ওয়াং এবং তাঁর দল প্রমাণ করেছেন যে, সুচের নড়াচড়াকে যদি আমরা অসংখ্য টিউব বা নলের মতো কল্পনা করি, তবে এর পুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয় জায়গার মধ্যে একটি বিশেষ গাণিতিক সম্পর্ক থাকে। গণিতবিদেরা এটিকে এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলির মধ্যে অন্যতম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা জ্যামিতি ও টপোলজির ক্ষেত্রে নতুন পথ খুলে দিয়েছে।
স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন পারডনও এবারের ফিল্ডস মেডেল বিজয়ীদের একজন। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র জ্যামিতি ও টপোলজির জটিল বিষয় নিয়ে। তিনি এমন সব গাণিতিক কাঠামো নিয়ে কাজ করেছেন, যা জটিল জ্যামিতিক আকার এবং তাদের বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে নতুন ধারণা দিয়েছে। তাঁর কাজের গভীরতা এবং নতুনত্বের কারণে গণিত জগতের অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে উঠেছে। সামগ্রিকভাবে, এই চার তরুণ গণিতবিদের অর্জন মানবজাতির জ্ঞান ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য এক নতুন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।