সোমবার, 24 আগস্ট 2026
⚠ ব্রেকিং
AI 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

এআই বিপ্লব: বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির জন্য অপার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ নিয়ে এসেছে। তবে এক্ষেত্রে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির উপযোগী এআই মডেল তৈরি করা অত্যাবশ্যক। বিদেশি মডেলের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শেয়ার করুন:
এআই বিপ্লব: বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির জন্য অপার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

১০ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক লেকচারে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জ্যঁ লুই আরকাঁ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারে বাংলাদেশের মতো নিম্নদক্ষ অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগের কথা তুলে ধরেছেন। রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে 'এআই, উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা ও শ্রম পুনর্বণ্টন' শীর্ষক এই লেকচারটির আয়োজন করে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। অধ্যাপক আরকাঁ তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন যে, এআই বিপ্লবকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থানীয় বাস্তবতার উপযোগী এআই সক্ষমতা তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে।

অধ্যাপক জ্যঁ লুই আরকাঁ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে বেশিরভাগ শক্তিশালী এআই মডেলে ইংরেজি এবং কয়েকটি প্রভাবশালী ভাষার আধিপত্য রয়েছে, যার ফলে বাংলাসহ অন্যান্য স্থানীয় ভাষায় মডেলের ঘাটতি দেখা যায়। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের জন্য নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এআই মডেল তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি সতর্ক করে দেন যে, বিদেশি এআই মডেলের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই দেশের নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী এআই প্রযুক্তিকে মানিয়ে নেওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।

কর্মসংস্থানের উপর এআইয়ের প্রভাব প্রসঙ্গে অধ্যাপক আরকাঁ প্রচলিত ধারণার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, যদিও এআই কিছু ক্ষেত্রে শ্রমকে প্রতিস্থাপন করতে পারে, তবে এর প্রভাব কেবল কর্মসংস্থান কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং, এআই প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য কাজের উৎপাদনশীলতা বহুগুণে বৃদ্ধি করে নতুন নতুন কাজ এবং শ্রমের চাহিদা তৈরি করতে পারে। সামগ্রিকভাবে, এআইয়ের প্রভাব ইতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তিনি আরও জানান যে, এআই ডেটা সেন্টার ব্যবহারে পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে চলমান আলোচনা প্রসঙ্গে অহেতুক উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দেন, কারণ গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব।

গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট বলেন, একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত উচ্চদক্ষ অর্থনীতির তুলনায় নিম্নদক্ষ অর্থনীতিগুলো এআই থেকে বেশি লাভবান হতে পারে। যেসব খাতে উৎপাদনশীলতা তুলনামূলকভাবে কম, সেসব খাতে এআই গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। তার মতে, একটি প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের ফলে কিছু কাজের প্রয়োজন কমে যেতে পারে, তবে একই সাথে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য কাজ আরও উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে, যার ফলে এসব কাজে শ্রমের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, এআই শ্রমকে প্রতিস্থাপন করলেও পুরোপুরি শ্রমের প্রয়োজনীয়তা শেষ করে দেবে—এমন ধারণা সঠিক নয়; বরং কাজের ধরনে পরিবর্তন আসবে এবং শ্রমকে নতুন নতুন কাজে পুনর্বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের জন্য এআইয়ের অন্যতম বড় সম্ভাবনা হিসেবে অধ্যাপক আরকাঁ কোডিং ও সফটওয়্যার খাতের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত কয়েক দশকে ভারত কোডিং ও প্রোগ্রামিংয়ে বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে, যেখানে তাদের আইআইটি থেকে আসা দক্ষ কোডাররা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন। অধ্যাপক আরকাঁ মনে করেন, এআইয়ের কারণে বাংলাদেশের সামনেও এই পরিস্থিতি বদলানোর এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে। কোড রাইটিংসহ বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহারের মাধ্যমে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাও এখন উচ্চমানের কোড তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছেন, যা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য প্রযুক্তি খাতে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার বা 'লিপফ্রগ' করার এক দারুণ সুযোগ এনে দিয়েছে। গবেষণার মডেল অনুযায়ী, কোনো কাজে দক্ষতা বা সফলতার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হলে এআই সেই কাজের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বেশি কার্যকর হতে পারে, যা বাংলাদেশের কোডিং খাতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনতে পারে।

তৈরি পোশাক খাতে অটোমেশন ও রোবট নিয়ে প্রচলিত উদ্বেগের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক আরকাঁ বলেন, স্বয়ংক্রিয়করণের ফলে ব্যাপক বেকারত্ব তৈরি হবে—এমন ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার পুরোপুরি মিল নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, অটোমেশন অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পরিবর্তে বিভিন্ন কাজের মধ্যে শ্রম পুনর্বণ্টন করে এবং নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি করে। এটি কর্মীদের জন্য আরও উন্নত দক্ষতা অর্জনের পথ খুলে দেয় এবং সামগ্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মূল্য সংযোজন করে। তাই, পোশাক শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এআই ও অটোমেশনকে ভয়ের পরিবর্তে একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই লেকচারে অধ্যাপক জ্যঁ লুই আরকাঁ তার বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, এটি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক রূপান্তরের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। সঠিক নীতি, বিনিয়োগ এবং নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ এআই বিপ্লবের পূর্ণ সুফল অর্জন করে বৈশ্বিক অর্থনীতির মঞ্চে এক নতুন অবস্থান তৈরি করতে পারে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় এআই গবেষণা ও উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া অপরিহার্য।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ