কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অগ্রগতির ধারায় ওপেনএআই তাদের চ্যাটজিপিটি ম্যাকওএস ডেস্কটপ অ্যাপে একটি যুগান্তকারী নতুন ফিচার চালু করেছে, যার নাম 'কম্পিউটার হিস্ট্রি'। এই উদ্ভাবনী সুবিধাটি ব্যবহারকারীদের কম্পিউটারে করা বিভিন্ন কাজের একটি সময়ভিত্তিক ইতিহাস তৈরি করে, যার মূল লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীর কাজের ধরন বুঝে আরও ব্যক্তিগত ও কার্যকর সহায়তা প্রদান করা। এই ফিচারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু থাকে না; ব্যবহারকারীকে নিজ উদ্যোগে এটি সক্রিয় করতে হয়, যা ডেটা সুরক্ষার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘কম্পিউটার হিস্ট্রি’ চালু থাকলে চ্যাটজিপিটি এবং এর কোডেক্স মডেল ব্যবহারকারীর পূর্ববর্তী কাজের তথ্যের ভিত্তিতে চলমান কোনো কাজ শেষ করতে সহায়তা করতে পারে, আগের কাজের ধারাবাহিকতা বুঝতে সাহায্য করে, এমনকি ভবিষ্যৎ কাজের জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরির পরামর্শও দিতে সক্ষম। ইয়াহুটেক-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওপেনএআই জানিয়েছে যে এই নতুন ফিচারটি তাদের আগের ‘ক্রনিকল’ ফিচারের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। যেখানে ক্রনিকল মূলত স্ক্রিনশটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর কাজের ইতিহাস তৈরি করত, সেখানে ‘কম্পিউটার হিস্ট্রি’ কিবোর্ডে চাপ দেওয়া ও মাউসের ক্লিকের মতো ইন্টারঅ্যাকশন রেকর্ড করে। তবে এটি সরাসরি কম্পিউটারের স্ক্রিন বা অডিও রেকর্ড করে না, যা ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ব্যবহারকারীর হাতে এই ফিচারের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তারা চাইলে কোন কোন অ্যাপ্লিকেশন ও ওয়েবসাইটের কার্যক্রম ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নির্ধারণ করতে পারবেন। যেকোনো সময় এই ইতিহাস দেখা এবং মুছে ফেলার সুযোগও রয়েছে। ব্যক্তিগত বা ইনকগনিটো ব্রাউজারে থাকা অবস্থায় সংগৃহীত তথ্য ‘কম্পিউটার হিস্ট্রি’তে যুক্ত হবে না, যা ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে সহায়ক। এই নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা ব্যবহারকারীদের ডেটা ব্যবহারের ওপর আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই ফিচারের অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো, কোনো কাজের মাঝখানে ব্যবহারকারী যদি বাধাগ্রস্ত হন, তবে চ্যাটজিপিটি আগের কাজের প্রেক্ষাপট বুঝে সহযোগিতা করতে পারবে। এটি ব্যবহারকারীর নিয়মিত কাজের ধরন বিশ্লেষণ করে কোন অ্যাপ বা পদ্ধতি ব্যবহার করেন, তা বুঝতে পারে। এমনকি ব্যবহারকারীর নিয়মিত কাজের ধরন বিশ্লেষণ করে নতুন ‘স্কিল’ তৈরি বা স্বয়ংক্রিয় কাজের পরামর্শও দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিদিন সকালে দলের জন্য কাজের আপডেট তৈরির মতো কোনো কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করার ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে, যা কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
তবে কম্পিউটারে ব্যবহারকারীর কার্যক্রমের এত বিস্তারিত ধারণা তৈরি হওয়ায় গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অফিসের কম্পিউটারে সংবেদনশীল তথ্য, আর্থিক তথ্য, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই ফিচারটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যের সুরক্ষার দিকটি বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে ফাঁস না হয়।
ওপেনএআইয়ের নথি অনুযায়ী, কম্পিউটার হিস্ট্রির কিছু ফাইল এনক্রিপ্টেড নয়, যা একটি উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। ব্যবহারকারীর ম্যাকে সাময়িকভাবে সংরক্ষিত ইন্টারঅ্যাকশন তথ্য ৪৮ ঘণ্টা পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলা হলেও, পরে তৈরি হওয়া সাধারণ টেক্সটভিত্তিক মার্কডাউন ফাইল ব্যবহারকারী দেখতে ও পরিবর্তন করতে পারেন। একই ম্যাকওএস ব্যবহারকারীর অধীনে চলা অন্য প্রোগ্রামও সেগুলোতে প্রবেশ করতে পারে, যা ডেটা সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি দুর্বলতা। এছাড়া, ক্ষতিকর ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে ‘প্রম্পট ইনজেকশন’ বা ম্যালওয়্যারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে, যা ব্যবহারকারীর ডেটার অপব্যবহারের পথ খুলে দিতে পারে।
এই নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো এড়াতে ওপেনএআই সংবেদনশীল অ্যাপ ও ওয়েবসাইটগুলোকে ইতিহাসের বাইরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। ‘কম্পিউটার হিস্ট্রি’ ব্যবহার করতে হলে প্রথমে ম্যাকে চ্যাটজিপিটির ডেস্কটপ অ্যাপ ইনস্টল থাকতে হবে। এরপর সেটিংসে গিয়ে ‘ইন্টিগ্রেশনস’ থেকে ‘কম্পিউটার হিস্ট্রি’ নির্বাচন করে ফিচারটি চালু করতে হবে। প্রয়োজনে ‘মেমোরিজ’ চালু করতে হবে, কারণ কাজের তথ্য বিভিন্ন চ্যাট ও টাস্কে ব্যবহারের জন্য এর প্রয়োজন হয়। সবশেষে, কোন কোন অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের তথ্য অন্তর্ভুক্ত হবে তা নির্বাচন করে ম্যাকওএসের প্রয়োজনীয় অনুমতি দিতে হবে।
বর্তমানে ফিচারটি কেবলমাত্র ম্যাকওএসের জন্য চালু হলেও, ওপেনএআই উইন্ডোজ সংস্করণও আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ব্যবসায়িক ও এন্টারপ্রাইজ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে এই ফিচার ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রশাসকের অনুমতি প্রয়োজন হবে, যা কর্পোরেট ডেটা সুরক্ষার মানদণ্ড বজায় রাখতে সহায়ক হবে। সামগ্রিকভাবে, ‘কম্পিউটার হিস্ট্রি’ ফিচারটি একদিকে যেমন ব্যবহারকারীদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করবে, তেমনি অন্যদিকে ডেটা সুরক্ষা ও গোপনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে।