সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন (WAIC)-এ চীন তার অত্যাধুনিক এআই সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা বৈশ্বিক প্রযুক্তি পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বেইজিং এই মঞ্চকে ব্যবহার করে 'ওপেন সোর্স' উন্নয়ন এবং 'অন্তর্ভুক্তিমূলক এআই' ধারণার উপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক এআই শাসনের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনায় একটি অগ্রণী ভূমিকা পালনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এই চার দিনের সম্মেলনে চীনের ১,০০০ এরও বেশি প্রযুক্তি সংস্থা, কর্মকর্তা, গবেষক এবং শিল্প ব্যক্তিত্বের প্রতিনিধিরা অংশ নেন, যা দেশটির এআই খাতে গভীর আগ্রহ এবং বিনিয়োগের প্রমাণ দেয়।
সম্মেলনের মূল বক্তৃতায় চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৈশ্বিক এআই মান নির্ধারণে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেন। তিনি 'জাতীয় নিরাপত্তা' ধারণার "অতি-বিস্তার" এর সমালোচনা করেন, যা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং বিধিনিষেধের দিকে ইঙ্গিত করে। যদিও শি জিনপিং সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করেননি, তবে একটি নতুন এআই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রবক্তা হিসেবে নিজেদের posicion (অবস্থান) এবং যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার বেইজিংয়ের প্রচেষ্টা ছিল সুস্পষ্ট। চীনের এই কৌশলগত অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নেদারল্যান্ডসের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং চীনের ডিজিটাল প্রযুক্তি নীতির বিশেষজ্ঞ রোগিয়ার ক্রিমার্স ডয়চে ভেলেকে জানান, এই বছরের সাংহাই শীর্ষ সম্মেলন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দিয়েছে। ক্রিমার্সের মতে, WAIC নির্দেশ করে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন বেইজিংয়ের অন্যতম রাজনৈতিক অগ্রাধিকার। চীন ওপেন-সোর্স এআই মডেলগুলিকে সমর্থন করে এবং এআই-চালিত শিল্পায়নকে প্রচার করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগিতা করতে চায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই প্রচেষ্টার জন্য চীন গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সমর্থন লাভের আশা করছে, যা তাদের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল উন্নয়নে চীন ধারাবাহিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্যবধান কমাচ্ছে এবং শিল্প প্রক্রিয়াগুলিতে এআই প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাদের প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে পরিপক্ক হচ্ছে। ডিজিএ-অ্যালব্রাইট স্টোনব্রিজ গ্রুপের চীন ও প্রযুক্তি নীতি বিষয়ক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পল ট্রায়োলো ডয়চে ভেলেকে জানান, চীনের এআই মডেল ডেভেলপাররা সীমিত কিন্তু উন্নত কম্পিউটার হার্ডওয়্যারে ওপেন-ওয়েট মডেলগুলিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের গতি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ট্রায়োলো বিশ্বাস করেন যে, চীনের উদ্যোগগুলিতে এআই-এর প্রয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে।
এছাড়াও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনা জনগণের মধ্যে এআই নিয়ে ভয় কম, যা ভোক্তা পর্যায়ে এআই অ্যাপ্লিকেশনগুলির দ্রুত গ্রহণকে সহজতর করছে। চলতি বছরের শুরুতে, চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছিল যে চীনা এবং মার্কিন এআই মডেলগুলির মধ্যে কর্মক্ষমতার ব্যবধান "উল্লেখযোগ্যভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে"। বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এই মূল্যায়নের সাথে একমত পোষণ করে বলেছেন যে, GLM-5.2 এবং Kimi K3-এর মতো চীনের বৃহৎ ভাষা মডেলগুলির (LLMs) কিছু বেঞ্চমার্ক পরীক্ষায় দেখা গেছে যে ব্যবধান কমছে বা এমনকি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। ট্রায়োলো উল্লেখ করেছেন যে, বেশিরভাগ অ্যাপ্লিকেশনের জন্য চীনের শীর্ষস্থানীয় ওপেন-ওয়েট এআই মডেলগুলি চালাতে সস্তা এবং বেশিরভাগ কাজ পরিচালনা করতে সক্ষম।
তবে, অ্যানথ্রোপিক, ওপেনএআই এবং গুগল-এর মতো শীর্ষস্থানীয় মার্কিন সংস্থাগুলির উন্নত মালিকানাধীন মডেলগুলির নিরাপত্তা এবং মাপযোগ্যতার মতো ক্ষেত্রে এখনও সুবিধা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ তার "ফ্রেমওয়ার্ক ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ডিফিউশন" এর মাধ্যমে এআই-সম্পর্কিত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত করে, যার আওতায় উন্নত কম্পিউটিং চিপস, নির্দিষ্ট এআই মডেলের ওয়েট এবং বৃহৎ আকারের এআই কম্পিউটিং অবকাঠামোতে প্রবেশাধিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের জন্য উন্নত চিপস এবং সেমিকন্ডাক্টর উত্পাদন সরঞ্জামের উপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণও বাড়িয়েছে, যা চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করার একটি প্রয়াস।
গেভকাল রিসার্চের গবেষণা পরিচালক লায়লা খাওয়াজা ডয়চে ভেলেকে জানান যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আংশিকভাবে সফল হয়েছে। নিয়ন্ত্রণগুলি চীনের চিপ তৈরির ক্ষমতাকে প্রভাবিত করেছে। তবে, এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, চীন তার নিজস্ব উদ্ভাবন এবং কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে এআই খাতে তার অবস্থান সুদৃঢ় করতে বদ্ধপরিকর। বেইজিংয়ের এই প্রচেষ্টা কেবল প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্যই নয়, বরং একটি নতুন বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার জন্যও, যেখানে চীনের নিজস্ব মূল্যবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হবে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং অর্থনীতির উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।