মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা, যা সম্প্রতি স্বাক্ষরিত শান্তি প্রক্রিয়া এবং সমঝোতা স্মারকের ভবিষ্যৎকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত মাসে যে যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল, মঙ্গল ও বুধবারের পাল্টাপাল্টি হামলা সেই আশার আলো অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। এই সংঘাতের জেরে দুই দেশের মধ্যেকার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এখন বড় ধরনের হুমকির সম্মুখীন, যদিও আপাতত নতুন করে কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি।
সংঘাতের এই আবহের মধ্যেই মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, আলোচনার পথ খোলা থাকলেও সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত। একই দিনে আরব সাগরে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে যুদ্ধবিমানগুলোতে অস্ত্রশস্ত্র সাজাতে দেখা যায় এবং এর পাইলটরাও সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের জন্য মহড়া চালান, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের এসব প্রস্তুতির ইঙ্গিতকে আরও স্পষ্ট করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক বার্তায় শুক্রবার তিনি উল্লেখ করেন যে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছে এবং তারা তাতে সম্মত হয়েছে। তবে একইসাথে তিনি এও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দুই দেশের মধ্যেকার যুদ্ধবিরতি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ। ট্রাম্পের এই ঘোষণা চলমান অচলাবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং সমঝোতা স্মারকের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এমন বৈরী পরিস্থিতিতেও ব্রিটিশ চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘রুসি’র জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল স্টিফেনস আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সমঝোতা স্মারকটি পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা দেখছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকটি এখনো টিকিয়ে রাখা সম্ভব, তবে এর জন্য উভয় পক্ষকে যথেষ্ট প্রচেষ্টা এবং সদিচ্ছা প্রদর্শন করতে হবে। স্টিফেনস এই মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, উদ্বেগের মূল কারণ হলো, কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের যুক্তি বা অবস্থান শুনতে আগ্রহী নয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
স্টিফেনস আরও মনে করেন যে, কূটনৈতিক উদ্যোগকে সফল করতে এবং চলমান অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কোনো না কোনো পক্ষকে প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। তার মতে, বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি অনেকটা অনুমিতই ছিল, কারণ সমঝোতা স্মারকের ভাষা বা শর্তাবলিতেই এর বীজ নিহিত ছিল। তিনি বিশ্লেষণ করে বলেন, চুক্তির একদম শুরুর দিকে ইরান বেশ কিছু সুবিধা আদায় করে নিয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে। আর ঠিক এই কারণেই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং সংঘাতের পথ প্রশস্ত হয়।
তবে এই গভীর সংকটের মধ্যেও মাইকেল স্টিফেনস একটি ইতিবাচক দিক লক্ষ্য করেছেন। তিনি দেখেছেন যে, এত উত্তেজনা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম খুব একটা বাড়েনি, যা সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সংঘাতের সময় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। স্টিফেনস বলেন, তেলের দাম লাফিয়ে না বাড়ার অর্থ হলো, বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন যে, এই সংকট সমাধানের একটি পথ এখনো খোলা আছে। তাদের হয়তো এই বিশ্বাস রয়েছে যে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে রূপ নেবে না, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
সামগ্রিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার সম্পর্কের এই নতুন মোড় মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে যেমন কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতির মাধ্যমে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। সমঝোতা স্মারকটি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে কিনা, তা নির্ভর করছে উভয় দেশের নেতৃত্ব কতটা বিচক্ষণতার সাথে এই সংঘাতময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এবং আলোচনার টেবিলে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে পারে তার ওপর। আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক মহল।