ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের মধ্যেই দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর পেছনে কাজ করেছে ইসরায়েলের সরবরাহকৃত এক গোপন গোয়েন্দা তথ্য। এই তথ্যে দাবি করা হয়েছে যে, তেহরান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার জন্য আবারও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করছে। ইসরায়েলের এই কথিত গোয়েন্দা তথ্যই ট্রাম্পকে পুনরায় ইরানে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণে উসকে দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে এবং একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে চরম চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি যখন চরম চাপের মুখে ছিল, ঠিক তখনই ট্রাম্পকে গুপ্তহত্যার এই কথিত পরিকল্পনার খবর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ইরান কর্তৃক ট্রাম্পকে গুপ্তহত্যার এই পরিকল্পনার নতুন সতর্কবার্তাটি চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছেছে। তবে অন্য একটি সূত্র দাবি করেছে যে, মার্কিন গোয়েন্দারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই তেহরানের এমন পরিকল্পনার আভাস পাচ্ছিল, কিন্তু ইসরায়েলের দেওয়া এবারের তথ্যটি সম্পূর্ণ নতুন এবং এতে একটি সুনির্দিষ্ট ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, যা পূর্বের তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরেই কিছু কর্মকর্তার মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যটি মূলত ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার একটি চতুর কৌশল হতে পারে। কারণ ট্রাম্প তখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন যে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করবেন, নাকি বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বজায় রাখবেন। ইসরায়েলের এমন কৌশলী পদক্ষেপের ফলে ট্রাম্প তার পূর্বের অবস্থান থেকে সরে এসে সামরিক পদক্ষেপের দিকে ঝুঁকেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের দেওয়া সতর্কবার্তাটির সুনির্দিষ্ট বিবরণ এখনো স্পষ্ট নয় এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করেনি। এমনকি, ইসরায়েলি সতর্কবার্তা পাওয়ার আগে মার্কিন প্রশাসন এটি ট্র্যাকও করছিল না বলে সিএনএন জানিয়েছে। এর ফলে ইসরায়েলের তথ্যের উদ্দেশ্য এবং সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এই তথ্য পাওয়ার পর দ্রুত মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের প্রভাবকে আবারও সামনে এনেছে।
উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন হামলায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান বহু বছর ধরেই প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছে। এমনকি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত আলী খামেনির পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ও পরবর্তী সময়ে খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মিছিলেও ইরানি শোকাহত জনতা ট্রাম্পের মৃত্যু চেয়ে স্লোগান দিয়েছে, যা তাদের প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষাকে স্পষ্ট করে তোলে।
স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পও চলতি সপ্তাহে তার জীবনের প্রতি ইরানি হুমকির ইঙ্গিত দিয়েছেন। আঙ্কারায় অবস্থানকালে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “তারা (ইরান) আমাকে সরিয়ে দিতে চায়। আমি তাদের প্রতিটি তালিকায় আছি। আজ সকালেও আমি দেখেছি যে আমি তাদের প্রতিটি তালিকায় রয়েছি। এ পর্যন্ত আমি কিছুটা ভাগ্যবান ছিলাম, কিন্তু এই ভাগ্য হয়তো খুব বেশিদিন স্থায়ী নাও হতে পারে।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইরানের কাছ থেকে তার জীবনের প্রতি হুমকির বিষয়টিকেই আরও জোরালো করেছে।
ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পারস্পরিক স্বার্থের ভিন্নতার কারণে ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার সম্পর্ক বেশ কিছুদিন শীতল ছিল। ইসরায়েলি নেতা তার যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন, অন্যদিকে ট্রাম্প এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে পারে—এমন উদ্বেগ থেকে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছিল।
তবে ইসরায়েলের কথিত গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু আবারও ফোনে কথা বলেছেন বলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নিশ্চিত করেছে। তেল-আবিব দাবি করেছে, ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল দুই দেশের মধ্যে ‘পারস্পরিক সমন্বয়’ অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে এবং পারস্য উপসাগরে সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক কার্যক্রম সম্পর্কে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে নতুন আপডেট দিয়েছেন। এই আলোচনা ইঙ্গিত দেয় যে, ইসরায়েলের দেওয়া তথ্য সম্ভবত ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে এবং দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় আবারও জোরদার হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।